মুসলিম ইতিহাসে একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিনের নাম ‘আশুরা’ যে নামের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক বহু ঘটনার আনাগোনা। যেগুলো আমাদের অন্তরের গহিনে এসে ক্ষত স্থানগুলোর ব্যথাকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আফসোসেরা তখনই ডানা মেলে ঘিরে ধরে যখন দেখি আমাদের মুসলিম সমাজ তাদের অস্থিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়; বরং তারা ভুলভাবে নিজেদের ইতিহাসকে তুলে ধরছে। আমাদের চার পাশে চোখ বুলালেই দেখা যায় পবিত্র ‘আশুরা’ নিয়ে আমাদের মধ্যে কত ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কার বিদ্যমান। এমনকি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক কথা এই যে, পবিত্র ‘আশুরা’ আমাদের তথাকথিত সমাজের লোক সাহিত্য ও অপসংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। অথচ আল্লাহ ও রাসূলে করিমের সুমহান আহ্বানে যেগুলোর কোনো স্থান নেই। যার ফলে আমরা ইসলামের যথার্থ আলো থেকে ক্রমেই সরে গিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি। আর এর প্রধান কারণ হচ্ছে- নিজেদের ঐতিহ্যকে জানার জগতে আমাদের বিচরণের স্বল্পতা।

হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ। মুসলিম উম্মাহর দ্বারে দ্বারে কড়া নাড়ে প্রতি বছর। আর মহররম মাসে রয়েছে এমন একটি দিন, যে দিনে দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে মহান আল্লাহ তায়ালা চিরকালের জন্য নবী মূসা আ: ও তার অনুসারী ঈমানদারদের ফেরাউনের জুলুম থেকে নাজাত দিয়েছিলেন এবং এই ফেরাউনকে তার বাহিনীসহ লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরে ফেলার মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছিলেন সীমালঙ্ঘনকারী ফেরাউনসহ তার বিশাল বাহিনী ও বিশ্ববাসীকে। যেদিন আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছিল নবী মূসা আ:-এর বিজয় ও ভ্রষ্ট ফেরাউন এবং তার সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে। সে দিনটিই ছিল পবিত্র আশুরা তথা মহররম মাসের ১০ তারিখ।
কিন্তু অনেকেই যথাযথভাবে না জেনে এমনকি ভ্রান্ত প্ররোচনায় পতিত হয়ে ‘আশুরা’ বলতে, কারবালার ময়দানে রাসূল সা:-এর প্রিয়তম দৌহিত্র হজরত হোসাইন রা: ও নবী পরিবারের কিছু সম্মানীয় ব্যক্তির শাহাদাতের ঘটনাকেই বুঝে। তাদের অধিকাংশদের মতে, কারবালাকে কেন্দ্র করেই ‘আশুরা’র ঐতিহাসিক বিচরণ। কিন্তু ইহুদিদের উদ্দেশ করে রাসূল সা:-এর বাণীতে লক্ষ করা যায়, নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, ‘হজরত মূসা আ:-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে অধিক হকদার। অতঃপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং উম্মতকে তা পালন করতে নির্দেশ দেন’ (বুখারি-৩৩৯৭, মুসলিম-১১৩৯)।

উপরের হাদিস থেকে এটিই বোঝা যায়, কারবালার ঘটনার আগেও ‘আশুরা’র ইতিহাস রহস্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। এমনকি মহানবী সা:-এর দাওয়াতি জিন্দেগিতে বিশেষত হিজরতের আগে ও পরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে মহররম মাসের সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু হায়! আশুরা নিয়ে আমাদের প্রচলিত অনেক ধারণা ও কার্যাবলি রয়েছে যেগুলো সম্পূর্ণ ইসলামী ইতিহাস ও বিধানের বিপরীত স্রোতে বেয়ে চলেছে। সেসব কুসংস্কারের মধ্যে অন্যতম হলো- ১. আশুরা উপলক্ষে নিজের শরীরে আঘাত করে রক্ত বের করা। যা নিতান্তই অমূলক। কারণ এহেন কর্মের কোনো নির্দেশনা ইসলামে নেই। ২. রণ-প্রস্তুতির মহড়া প্রদর্শন করা। কারবালার ইতিহাসের স্মরণে প্রচলিত যে রণসাজের আয়োজন করা হয়ে থাকে সে সম্পর্কে সাহাবি রা: ও তাবেয়ি রহ:, এমনকি উলামায়ে কেরামদের থেকে কোনো নির্দেশ পাওয়া যায় না।
৩. বিভিন্ন অঞ্চলে মেলার আয়োজন করা। ইসলাম এসব মেলাকে সমর্থন করে না। ৪. মহররমে জারি নামে গানের আসর জমানোর মতো ভয়ঙ্কর প্রচলনও আমাদের মুসলিম সমাজে বিদ্যমান। মানিকগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও মেহেরপুরসহ দেশের অনেক জায়গায় এই আসরের ব্যবস্থা করা হয়। আর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ৪০০ জারিগান এসব আসরের জন্য লিখিত হয়েছে এবং যেগুলো আশুরা উপলক্ষে গাওয়া হয়। ৫. বিয়ে থেকে বিরত থাকা, এমনকি বিশেষ খাবারের আয়োজন করা। এগুলো সম্পর্কে কোনো বিধান বা হুকুম ইসলামের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় আশুরা নিয়ে অনেক বেশি ভ্রান্ত রেওয়াজের প্রচলন রয়েছে, যেগুলো সেই মোগল ইতিহাসের পাতায়ও লক্ষ করা যায়। কিন্তু যে কর্মের সূত্র আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর বাণীতে পাওয়া যায় না তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।

‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২। যে দিন থেকে তিনি সব আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না’ (সূরা তাওবা-৩৬)।
হজরত আবু কাতাদা রা: সূত্রে বর্ণিত- রাসূল সা:-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়’ (মুসলিম-১১৬২)।
হাদিসে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা: বলেন, ‘রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা আল্লাহর মাস মহররমের আশুরার রোজা’ (সুনানে কুবরা-৪২১০)।
প্রত্যেক মুসলিম তার জীবনে সত্যের অরুণোদয়ে রঙিন হওয়া এবং কুরআন হাদিসের নির্দেশে আঁকড়ে ধরে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পাড়ি দেয়ার মাধ্যমেই দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে সক্ষম হবে। আর সে জন্য ইসলামের বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত ধারা এবং অমাবস্যার অন্ধকার থেকে ভোরের সোনালি আলোর দিকে ফিরে আসবে এটিই ছিল আমার রাসূল সা:-এর কল্যাণ আকুতি। তাহলে চলুন আজ থেকে নিজের অস্থিত্ব সম্পর্কে সজাগ হই এবং উত্তম আদর্শকে আলিঙ্গন করি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক স্টাডিজ