সমাজের কিছু কুসংস্কার এমন পাবেন, যা বহু দিন যাবত চলে আসছে। যুগের পর যুগ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুুকে ঘাপটি মেরে বসে আছে। সেসব মানুষের মন-মানসিকতায় এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, শত চেষ্টা করে তাদেরকে আদর করে বুঝিয়েও এসব কুসংস্কার দূর করা সম্ভব নয়। এসব যেন তাদের ভালো লাগার জায়গা। কোনোক্রমে যদি কোনো দ্বীনি ফ্যামিলির পদচারণায় ইসলামী অনুশাসন মেনে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, এতে কিছু মানুষের কথা শোনতে হয়। বকাঝকা শোনতে শোনতে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।
সেসব সামাজিক কুসংস্কারের মধ্যে, মৃত্যুপরবর্তী সময়ের প্রথা এবং বিবাহের অনুষ্ঠানের প্রথা উল্লেখযোগ্য।
বিয়ের প্রথার মধ্যে রয়েছে, গেট প্রথার বিড়ম্বনা এবং দেনমোহর, বরের খাবার পরিবেশন ও বউ সাজানোর ট্যাক্স! বিয়ে মানেই যদি গেট সাজানো হয়! তা প্রথা না হয়ে কিভাবে পারে?
আপনি বহু দূর পাড়ি দিয়ে গরমের প্রখরতা উপেক্ষা করে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে মেয়ের বাড়ি পৌঁছলেন!
ঠিক সেই সময়ে গেট সাজিয়ে একদল নারী এসে দাঁড়িয়ে থেকে আপনাকে ট্যাক্স আদায়ে বাধ্য করল! যদি আপনি তাদের চাহিদা মতো অর্থ কড়ি দিতে পারেন, তবেই তারা গেট খুলে দেবে। আর যদি তাদের বাজেট অনুপাতে ট্যাক্স আদায়ে গড়িমসি করেন, তবে দীর্ঘসময় সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এতে আপনাদের ঘামের মাত্রা আরো বহু গুণে বেড়ে যাক- তাতে তাদের কিছু আসে যায় না!
এটি কি কোনো সামাজিকতা হতে পারে? একে আবার কেমন সামাজিকতা বলে?
এরপর আসুন দেনমোহর নির্ধারণ বিষয়ে!
সেখানে আবার কয়েক ঘণ্টার বিড়ম্বনা! বর্তমান সময়ের মেয়ে পক্ষ চায়, দেনমোহর পরিমাণ বাড়িয়ে নির্ধারণ করতে। আর ছেলে পক্ষ চায় কমিয়ে দিতে। মেয়ে পক্ষের ধারণা, যদি দেনমোহর বেশি করে নির্ধারণ করা হয়- তবে ছেলে চাইলেই যখন তখন তাদের মেয়েকে ডিভোর্স দিয়ে দিতে পারবে না! এতে একটু হলেও ছেলে ভয়ে থাকবে, যদি আমি তাকে ডিভোর্স দিতে যাই তবে আমাকে বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হবে।
আবার ছেলে পক্ষের চিন্তাধারা হলো- যত কম করে মোহরানা ধার্য করা যায়, ততই আমাদের জন্য নিরাপদ! এতে আমরা মেয়ের বড় অঙ্কের পাওনা আদায়ের প্যারা থেকে বেঁচে গেলাম!
অথচ তাদের উভয় পক্ষের ইসলামের নির্দেশনা বুঝে সমাজের কুপ্রথা উপেক্ষা করে ইসলামের নীতিমালা মেনে নেয়া উচিত। ইসলাম বলে, মোহরানা সম্পূর্ণ মেয়ের হক, যা ছেলেকে আদায় করে দিতেই হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা আমাদের স্ত্রীদের থেকে যে স্বাদ গ্রহণ করো, তার বিনিময়ে অপরিহার্য ফরজ হিসেবে তাদের মোহর পরিশোধ করো’ (সূরা নিসা-২৪)।
নারী এমন কোনো ফেলনা বস্তু নয় যে, চাইলেই কোনো এক পুরুষ বিয়ে করে উপভোগ করা শুরু করে দেবে! বরং নারী সম্মানিত জাতি। এই জাতির মূল্যায়ন প্রতিটি সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। যাতে করে নারী দেনমোহরের টাকার মাধ্যমে কিছুটা হলেও আর্থিক সাপোর্ট পেতে পারে।
নারীকে নিজের সতিত্ব যথাযথ রক্ষার্থে পর্দার বিধান মেনে চলতে হয়। ইসলাম নারীর নানা দিক বিবেচনায় রেখে তার জন্য দেনমোহরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। যাতে সে তার দেনমোহরের অর্জিত টাকা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের প্রয়োজনটুকু পূরণ করতে পারে।
অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই নারীর হক দেনমোহর নিয়ে সমাজ এক বড় তামাশা শুরু করে দিয়েছে! কোটি টাকা ধার্য করার কী অর্থ? যদি সেই টাকা নারী তার স্বামীর কাছ থেকে বুঝেই না নিতে পারে!
তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথা নয়, ইসলামের অনুশাসন মেনে চলাই নিরাপদ ও নিয়ামক।
হাদিসে এসেছে। নবী করিম সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো একটি পরিমাণ মোহরানা ধার্য করে কোনো নারীকে বিয়ে করল, অথচ আল্লাহ জানেন তা পরিশোধ করার ইচ্ছে তার নেই, এ ব্যক্তি আল্লাহর নামে তার স্ত্রীকে প্রতারিত করল এবং নাহকভাবে তার সতিত্ব নিজের জন্য হালাল মনে করে ভোগ করল, এমন ব্যক্তি কিয়ামতে জিনাকারী ব্যভিচারী হিসেবে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে’ (মুসনাদে আহমাদ)। সুতরাং আসুন ইসলামের বিধান মেনে চলি, আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে আসি।
লেখক : মোহতামিম, সুলতানিয়া হাফিজুল উলুম মাদরাসা, সাভার, সবুজবাগ, ঢাকা