ইসলামের পরিভাষায় জাহান্নাম হলো পরকালে পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্রণাদায়ক আবাসস্থল। সে দিন যাদের আমলনামার প্রতি আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন তাদের শাস্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। মূলত জাহান্নাম একটি বিভীষিকাময় ও ভয়ঙ্কর শাস্তির স্থান। এটি আল্লাহ তায়ালার এক নিকৃষ্ট সৃষ্টি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে জাহান্নাম অত্যন্ত নিকৃষ্ট’ (সূরা আল ফুরকান-৬৬)। জাহান্নাম জাহান্নামিদের শাস্তির জায়গা ও দুঃখের কারাগার। কষ্টের অতল দরিয়া। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আর আমি জাহান্নামকে কাফিরদের জন্য কারাগার করেছি’ (সূরা বনি ইসরাইল-৮)।
জাহান্নামের শাস্তিসমূহের অন্যতম একটি উপাদান হলো আগুন। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমাদের এই আগুন, জাহান্নামের আগুনের ৭০ ভাগের এক ভাগ মাত্র।’ তখন সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, দুনিয়ার এ আগুনই তো পাপীর জন্য যথেষ্ট ছিল।’ তিনি বললেন, ‘এ আগুনকে আরো ৬৯ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং প্রত্যেক অংশে তার সমপরিমাণ উত্তাপ রয়েছে’ (বুখারি-৩২৬৫)। দুনিয়ার আগুনের চেয়ে আরো ৬৯ গুণ বেশি তাপসম্পন্ন জাহান্নামের আগুনে জাহান্নামিদের নিক্ষেপ করে শাস্তি দেয়া হবে। আর এই আগুনের তাপ কখনো প্রশমিত হবে না। দুনিয়ার আগুন শরীরের শুধু বাহ্যিক অংশ পোড়াতে পারে কিন্তু জাহান্নামের আগুনের তাপ এমন হবে, যা জাহান্নামিদের শরীর পোড়ানোর পাশাপাশি তাদের হৃৎপিণ্ডও পুড়িয়ে ছাই করে ফেলবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘এটি আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি, যা তাদের হৃদয়কে গ্রাস করে ফেলবে’ (সূরা হুমাজা : ৬-৭)।
কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে হাশরের মাঠে উপস্থিত করা হবে। জাহান্নাম সে দিন জাহান্নামিদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ থাকবে। মানুষের ওপর হামলে পড়তে চাইবে। তখন সে রাগ ও ক্ষোভে গর্জন এবং হুঙ্কার দিতে থাকবে। সে দিন জাহান্নামিদের হাত-পা ও ঘাড়-গলা শিকলে বেঁধে বেড়ি পরিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় উপুড় করে দলে দলে জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা হবে। জাহান্নামের শাস্তি দুনিয়ার শাস্তি থেকে কোটি কোটি গুণ বেশি হবে। গুনাহের তারতম্যের কারণে শাস্তিও কমবেশি হবে। সামুরা ইবনে জুনদুব রা: থেকে বর্ণিত- রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘জাহান্নামিদের মধ্যে কারো জাহান্নামের আগুন তার পায়ের টাখনু পর্যন্ত পৌঁছবে; কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত আবার কারো কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছবে’ (মুসলিম-২৮৪৫, মুসনাদে আহমাদ-২০১১৫, মিশকাত-৫৬৭১)।
আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামিদের এমন কালো কুৎসিত চেহারায় পরিণত করবেন, যেন তা অন্ধকার রাত্রি সমতুল্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- ‘জাহান্নামের আগুন তাদের মুখমণ্ডল ঝলসে দেবে এবং তাতে তাদের চেহারা বীভৎস আকার ধারণ করবে’ (সূরা মু’মিনুন-১০৪)। জাহান্নামিদের বিছানা হিসেবে আল্লাহ তায়ালা আগুনের তৈরি বিছানা নির্ধারণ করে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- ‘তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুনের বিছানা এবং তাদের ওপরের দিকেও থাকবে (ঢেকে দেয়া হবে) আগুনের আচ্ছাদন। আর আমি এভাবেই জালিমদের প্রতিদান দেই’ (সূরা আরাফ-৪১)।
জাহান্নামের বাতাস হবে ‘সামুম’ যা হবে অত্যন্ত শুষ্ক ও উত্তপ্ত। আল্লাহ জাহান্নামিদেরকে প্রচণ্ড ক্ষুধা প্রদান করবেন। আর এই ক্ষুধার্ত জাহান্নামিদের জাক্কুম নামক এক ধরনের বিষাক্ত গাছ ও তার ফল খেতে দেয়া হবে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নিশ্চয়ই জাক্কুম বৃক্ষ হবে জাহান্নামিদের খাদ্য। গলিত তামার মতো তাদের পেটের মধ্যে এমনভাবে ফুটতে থাকবে, যেমন গরম পানি ফুটতে থাকে’ (সূরা আদ-দুখান : ৪৩-৪৬)। কাঁটাযুক্ত এই গাছ এতটাই তিতা হবে যে, ভেতরের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে আসবে। কাঁটা গিয়ে গলায় আটকে থাকবে, গলা থেকে বেরও হবে না এবং ভেতরেও যাবে না। তখন তারা পিপাসার্ত হয়ে পানি চাইবে। যখন তারা পানি চাইবে তখন তাদের ফুটন্ত গরম পানি পান করতে দেয়া হবে। পিপাসার তীব্রতায় তারা গরম পানিই পান করবে। এই গরম পানির প্রভাবে ভেতরের নাড়িভুঁড়ি সব গলে ছিন্নভিন্ন হয়ে মলদ্বার দিয়ে বের হয়ে আসবে। এ ছাড়া সেখানে তাদের পুঁজমেশানো পানি পান করতে দেয়া হবে। সে তা অতিকষ্টে ঢোঁক গিলে পান করবে কিন্তু তা গলার ভেতরে প্রবেশ করাতে পারবে না। তারা গরম পানি পান করার সময় তা ফেলে দিতে চাইবে। কিন্তু তা আর সম্ভব হবে না। গরমের তীব্রতায় তাদের মুখের চামড়া খসে পড়ে যাবে। এ ছাড়া জাহান্নামিদের আগুনের পোশাক পরিয়ে দেয়া হবে; যা তাদের সমস্ত শরীরকে পুড়িয়ে দেবে। আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামিদের আরো ভয়াবহ অবস্থা তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে বলেন- ‘অতএব যারা কুফরি করে, তাদের জন্য আগুনের পোশাক তৈরি করা হয়েছে। আর তাদের মাথার ওপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়া হবে। যার ফলে তাদের পেটে যা আছে তা এবং চামড়া গলে বের হয়ে যাবে। তাদের (শাস্তির) জন্য আছে লোহার হাতুড়ি। তারা যখনই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে তার ভেতরে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বলা হবে- দহনযন্ত্রণা আস্বাদন করো’ (সূরা হজ : ১৯-২২)। জাহান্নামিদের আলকাতরার পোশাকও পরানো হবে। কারণ আলকাতরায় আগুন লাগানো হলে সে আগুনের উত্তাপ ও তীব্রতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়। আল্লাহ বলেন- ‘তাদেরকে আলকাতরার পোশাক পরানো হবে এবং আগুনের শিখা তাদের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন করবে’ (সূরা ইবরাহিম-৫০)। তা ছাড়া অতিশয় ঠাণ্ডা ও হিমপ্রবাহ দিয়েও আরেক ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। বরফের চেয়ে শতগুণ ঠাণ্ডা জায়গায় তাদের রাখা হবে। সে আজাব হবে করুণ। জাহান্নামে প্রতিনিয়ত শাস্তি বাড়তে থাকবে। প্রতিদিন যে শাস্তি দেয়া হবে তা তার আগের দিনের চেয়ে বেশি হবে। অর্থাৎ এই শাস্তিতে কারো অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ভাবেই জাহান্নামের জীবন চলতে থাকবে।
অতএব আমাদেরকে জাহান্নামের এ ভয়াবহ আজাব থেকে বাঁচতে হলে আল্লাহর দরবারে সমস্ত গুনাহ মাফের জন্য সঠিকভাবে তওবা করে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর সবাইকে জাহান্নামের এ ভয়াবহ শাস্তি থেকে হিফাজত করুন। আমীন।
লেখক : সম্পাদক মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা