সমাজের কিছু বিষয় এমন আছে, যা লোকমুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। আর কিছু প্রচলিত জিনিস কুসংস্কার হিসেবে চলে আসছে। অন্য দিকে কিছু জিনিস শরিয়ত সম্মতভাবে চলে আসছে। যেসব জিনিস ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী চলে আসছে, তা নিয়ে তো কারো কোনো মাথাব্যথা নেই; কিন্তু যেসব জিনিস ইসলাম সমর্থিত নয়, সেসব বিষয় নিয়ে সমাজে মাতামাতির পরিমাণও কম নয়।
তার মধ্যে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাওয়ার প্রচলন বহু আগে থেকেই চলে আসছে। এমনকি তা সমাজের আষ্টেপৃষ্ঠে প্রকটভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
ফলে এর বিরুদ্ধে সমাজের মানুষকে কিছু বুঝাতে গেলে উল্টো ভুল বুঝে বসে থাকে। ভাবে আমাদেরকে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে, মানুষদের খাওয়াতে বারণ করছে!

অথচ বিষয়টি তো এমন নয়।
কারণ, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি এখনো বণ্টন হয়নি। কিংবা তার কোনো নাবালক সন্তান রয়েছে, যে তার সম্পত্তি বুঝে নেয়নি। সেই অবস্থায় যদি মৃত ব্যক্তির অবণ্টিত কিংবা নাবালক শিশুর ভাগের সম্পত্তি থেকে জিয়াফত বা কুলখানি, চল্লিশা, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে,
সেটি আপনার যুক্তিতে কী বলে?
কখনো বিবেক সমর্থিত কাজ হতে পারে?
আবার দেখুন, যে মানুষটি সবেমাত্র ইন্তেকাল করল- এখনো তার বাড়ি থেকে শোকের রেশ কেটে ওঠেনি। সর্বত্র শোকের মাতম চলছে। এমতাবস্থায় সেই শোকার্ত পরিবারকে চাপে ফেলা কিভাবে যুক্তিসঙ্গত কাজ হতে পারে?
যেখানে স্বয়ং নবী করিম সা: মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাবার নিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, সেখানে আমরা রাসূলের নির্দেশনা পালনের পরিবর্তে কুসংস্কার নিয়ে পড়ে আছি!

ফলে মৃত ব্যক্তির শোকার্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন! (আবু দাউদ-৩৭৫৪)
তারা ভাবে, যদি আমরা বাবার মৃত্যু উপলক্ষে কোনো জিয়াফতের আয়োজন না করি, এতে লোকজন কী মনে করবে? এসব ভেবে তারা শেষমেশ বাধ্য হয়েই জিয়াফতের আয়োজন করে। শুধু তাই নয়! সমাজের এমনো ঘটনা শোনা যায় যে, জিয়াফতকে অতি আবশ্যক মনে করে নিরুপায় হয়ে জমি সুদে দিয়ে টাকা এনে অনুষ্ঠান করে! এর চেয়ে আর অবাক হওয়ার কথা কী হতে পারে?
এটি কতবড় নির্লজ্জতা যে, মৃত বাড়ির লোকদের জিয়াফত খাওয়াতে সমাজ বাধ্য করছে!
মানুষের জিয়াফতবিষয়ক ধারণা হলো, এটি অনেক বড় ফজিলতপূর্ণ কাজ। তাই টাকাওয়ালাদের কেউ কেউ জমজমাট আয়োজনও করে থাকে। তাই, কেউ কিছু ছাত্র এনে কুরআন খতম করিয়ে তাদের পেট পুরে খানা খাইয়ে থাকে। আবার খাবার শেষে মোটামুটি বড় অঙ্কের এক হাদিয়াও ধরিয়ে দিয়ে থাকে।
এখানে অনেক লোকের ধারণা হলো, আমরা যেহেতু আলেম নই। উম্মি মানুষ। সেহেতু আলেম সম্প্রদায় এনে তাদের দিয়ে দোয়া করাতে হবে। এই ভেবে তারা আলেমদের দাওয়াত দিয়ে থাকে।
ফলে আয়োজক-দাওয়াতগ্রহীতা উভয়ই গুনাহের ভাগিদার হয়ে যায়।

আয়োজক কুরআন পড়িয়ে বিনিময় দেয়ায়- আয়োজনটি গর্হিত হিসেবে গণ্য হয়। আর দাওয়াত গ্রহীতারা কুরআন পড়ার বিনিময়ে খাবার খাওয়া, কুরআন পড়ে বিনিময় গ্রহণের মতো গর্হিত কাজে জড়িয়ে পড়ে। যা কখনোই ইসলাম বৈধতা দেয়নি।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে জীবিতদের কর্তব্য হিসেবে বৈধ উপায়ে অনেকগুলো করণীয় আছে। এর মধ্যে মৃত ব্যক্তির ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে বেশি বেশি দান-সদকা করা। সমাজের মানুষ যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে অধিক পরিমাণে দান-সদকার প্রচলন ঘটাতে পারে, সেটিই তার রূহের মাগফিরাতে সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ ও কার্যকর। রাসূল সা: বলেন, ‘যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া।
১. সদকায়ে জারিয়া; ২. এমন ইলম, যার দ্বারা উপকার হয়; ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্য দোয়া করতে থাকে। (মুসলিম শরিফ-৪১১৫)
মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তিনটি আমল চালু থাকে।
তা না করে যখন আমরা ভিন্ন পথ অবলম্বন করি, তখন আয়োজক, দাওয়াত গ্রহীতাসহ সবাই গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ি। যা আমাদের জন্য মোটেই সমীচীন নয়।
লেখক : খতিব, মসজিদ-এ-কোবা, বিনোদবাইদ, সাভার, ঢাক।