‘গুনাহ’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত হলেও এটি মূলত একটি ফারসি শব্দ। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় গুনাহ হলো আল্লøাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করা, নির্দেশ অবহেলা করা ও নিষেধ অমান্য করা। গুনাহের দ্বারা আল্লাহর অবাধ্যতা প্রকাশ পায় এবং আল্লাহ থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। গুনাহমুক্ত পবিত্র জীবনযাপন করা আদর্শ মানুষের কর্তব্য।
গুনাহ করা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। পার্থিব জীবনে মানুষ শয়তানের ধোঁকা, নফসের প্ররোচনা ও পরিবেশের তাড়নায় অনেক সময় নানা ধরনের গুনাহ করে থাকে। আনাস রা: কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তানই গুনাহগার। আর গুনাহগারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম তারাই যারা তাওবা করে।’ (সুনানে তিরমিজি-২৪৯৯, ইবনে মাজাহ-৪২৫১) তবে গুনাহ বর্জন করা ও গুনাহ থেকে পুরোপুরিভাবে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুমিন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। কুরআন ও হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে মানুষের অনেক গুনাহ মাফ হয়ে যায়। নিম্নে এসব আমলের কথা আলোচনা করা হলো :

নেক আমল করা : নেক আমল মুমিনের সর্বোত্তম সম্পদ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: নির্দেশিত পথে চলার মাধ্যমেই মানুষ নেক আমল ও সাওয়াব অর্জন করে। মুমিনের জীবনে নেক আমলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই নেক আমলকারীরা থাকবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে। আর বদ আমলকারীরা থাকবে জাহান্নামে।’ (সূরা ইনফিতার : ১৩-১৪) আবু জর গিফারি রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘তুমি যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো। আর কোনো গুনাহ করে ফেললে তার পরপরই নেক কাজ করো, যা তোমার পাপ মুছে দেবে। আর মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো।’ (সুনানে তিরমিজি-১৯৮৭) আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নিশ্চয়ই নেক কাজগুলো গুনাহকে দূর করে দেয়। আর এটি স্মরণকারীদের জন্য স্মরণ।’ (সূরা হুদ-১১৪)
দৈনন্দিন কিছু নেক কাজের মাধ্যমে সগিরা গুনাহ থেকে মাফ পাওয়া যায়। কিন্তু কবিরা গুনাহ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য অবশ্যই তাওবা করতে হবে। নেক কাজ নানাভাবে করা যেতে পারে। মানুষকে সালাম দেয়া, দান-সদকা করা, অন্যকে সহযোগিতা করা ও সর্বদা সত্য কথা বলার মাধ্যমে আমরা নেক কাজ করতে পারি।
কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা : গুনাহ মাফের অন্যতম উপায় হলো কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা। কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকলে বান্দার সগিরা গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে বলে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা যদি সেসব কবিরা গুনাহ পরিহার করো, যা থেকে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের ছোট ছোট গুনাহগুলো (সগিরা গুনাহগুলো) ক্ষমা করে দেবো এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব।’ (সূরা নিসা-৩১) এ ছাড়া কবিরা বা বড় বড় গুনাহ থেকে যারা বিরত থাকে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ক্ষমার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন- ‘আর যারা বড় বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে, তারা ছোটখাটো অপরাধ করলেও নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার ক্ষমা সুদূর বিস্তৃত।’ (সূরা নাজম-৩২)

রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করে না, সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে, রমজানের রোজা রাখে এবং কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে তার জন্য রয়েছে জান্নাত।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, কবিরা গুনাহ কী কী? রাসূল সা: বললেন, ‘আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, কোনো মুসলিমকে হত্যা করা এবং জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা।’ (নাসায়ি-৬১৮৫)
শিরকমুক্ত আমল করা : ‘শিরক’ এর অর্থ হলো আল্লাহর সাথে সত্তা, গুণ ও ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক বা অংশীদার করা। শিরক মারাত্মক কবিরা গুনাহ। এটি করার পর আমলনামায় আর কোনো সাওয়াব বাকি থাকে না। শিরক করার সাথে সাথে আমলনামায় আগে যে সাওয়াব ছিল, সে সাওয়াবগুলো মুহূর্তেই বরবাদ হয়ে যায়। শিরককারীদের কোনো আমল গ্রহণ করা হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘আর তারা যদি শিরক করত, তাহলে তারা যা আমল করেছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত।’ (সূরা আনআম-৮৮)

শিরক অমার্জনীয় অপরাধ ও মহাপাপ। আল্লাহ শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করার গুনাহ ক্ষমা করবেন না। আর তিনি এর চেয়ে ছোট যেকোনো গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরিক করে সে এক মহাপাপ করে।’ (সূরা আন নিসা-৪৮)
আল্লাহ আরো বলেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা আল মায়িদাহ-৭২)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘স্মরণ করো! যখন লোকমান আ: উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।’ (সূরা লোকমান-১৩) তাই শিরকমুক্ত থেকে আমল করে যাওয়াই মুমিনের দায়িত্ব।
সৃষ্টিজগতের প্রতি সদয় হওয়া : সৃষ্টিজগতের প্রতি সদয় আচরণ দ্বারাও গুনাহ মাফ হয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘একজন লোক রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লাগল। সে কূপে নেমে পানি পান করল। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেল যে, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবল, কুকুরটারও তার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে সেটি ধরে উপরে উঠে এসে কুকুরটিকে পান করাল। আল্লাহ তায়ালা তার আমল কবুল করেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দেন।’ রাসূল সা: বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই নেকি আছে।’ (বুখারি-২৩৬৩)

তাওবা করা : ‘তাওবা’ একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো সঠিক পথে ফিরে আসা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হওয়া ও আন্তরিক অনুশোচনা। ইসলামী পরিভাষায় কোনো অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজ হয়ে যাওয়ার পর অনুতপ্ত হয়ে সেই কাজের জন্য মহান প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং সেই অন্যায় কাজ ছেড়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ভালো পথে ফিরে আসাকে তাওবা বলা হয়। কোনো কোনো মনীষী বলেন, অনুতাপ ও অনুশোচনাসহকারে গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করাকে তাওবা বলে। ছোট-বড় সব গুনাহ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। গুনাহ করার সাথে সাথেই তাওবা করা উচিত। তাওবা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি আমল। যার দ্বারা আল্লাহ বান্দার যাবতীয় গুনাহ মাফ করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা নিজেই মুমিনদের তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, খাঁটি তাওবা; আশা করা যায়, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপগুলো মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরগুলো প্রবাহিত হতে থাকবে।’ (সূরা তাহরিম-৮)
রাসূল সা: বলেছেন, ‘হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর কাছে দিনে-রাতে ১০০ বার তাওবা করি।’ (মুসলিম-২৭০২)

তাওবা করার মাধ্যমে মুমিন বান্দা শুধু নিষ্পাপ ও গুনাহমুক্ত হয় না; বরং ইহকালীন ও পরকালীন বহু কল্যাণ এবং সুখ-শান্তিময় জীবন লাভ করেন।
ইস্তিগফার করা : ‘ইস্তিগফার’ একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় গুনাহের কথা স্মরণ করে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে ইস্তিগফার বলা হয়। আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘কেউ যদি কোনো মন্দ কাজ করে বা নিজের প্রতি জুলুম করে, এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুরূপে পাবে।’ (সূরা নিসা-১১০)
রাসূল সা: বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে ৭০ বারেরও বেশি ইস্তিগফার ও তাওবা করে থাকি।’ (বুখারি-৬৩০৭) তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন স্বীয় আমলনামা দেখে খুশি হতে চায় সে যেন বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ে।’ (বায়হাকি-৫৯৫৫)
ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘হে নারী সমাজ, তোমরা দান-সদকা করো এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ো। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই ছিলে অধিক।’ (মুসলিম-১৩২)
ইস্তিগফার শুধু অনুতাপ নয়, শুকরিয়া হিসেবেও করা হয়। ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহর রহমত ও নিয়ামত লাভ করা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, গুনাহ সব মুসিবতের মূল। তাই সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মানুষের জন্য একান্ত আবশ্যক। মানুষ যত বেশি গুনাহ থেকে দূরে থাকবে, তত বেশি তার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে এবং তার সম্মান বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা।