নিজস্ব প্রতিবেদক 

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরো ১১টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ সংগ্রহের ল্েয একটি চুক্তি করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসাইন এবং বোয়িংয়ের কমার্শিয়াল সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড ম্যাকমুলেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পে চুক্তিতে স্বার করেন। নতুন চুক্তির আওতায় পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ কেনা হবে। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছর বিমানের বোয়িং উড়োজাহাজ  কেনার ঘোষিত অর্ডার দাঁড়াল মোট ২৫টিতে। 
গত বুধবার অনুষ্ঠিত এ সম্পূরক চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেনÑ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপরে চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ। এ ছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেনÑ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি উইলিয়াম কিমিট, বোয়িং গ্লোবালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডান নেলসন, বোয়িং কমার্শিয়াল এয়ারপ্লেনসের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফানি পোপ, দণি ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুর, বোয়িং কমার্শিয়াল এয়ারপ্লেনসের ইউরেশিয়া, ভারত ও দণি এশিয়া অঞ্চলের বাণিজ্যিক বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগি এবং উভয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
চুক্তি স্বার অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসাইন বলেন, ‘আজকের এই সম্পূরক চুক্তি বিমানের চলমান বহর আধুনিকায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদপে। আমাদের বহর পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তার আলোকে এই ক্রয়াদেশ প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে বোয়িংয়ের সাথে আমাদের যে কার্যকর ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে, তা উড়োজাহাজ সরবরাহ ও পরবর্তী সহায়তা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আমাদের আস্থা জুগিয়েছে।’ 
বোয়িংয়ের অর্ডার ২৫টিতে : এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সাথে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছিল বিমান। প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার তালিকামূল্যের ওই প্যাকেজে ছিল আটটি ৭৮৭-১০, দু’টি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। এটি ছিল বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক উড়োজাহাজ ক্রয়চুক্তি। ওই চুক্তির উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। 
সর্বশেষ ১১টি যুক্ত হওয়ায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমানের মোট ঘোষিত অর্ডার দাঁড়িয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে ১৩টি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দু’টি ৭৮৭-৯ এবং ১০টি ৭৩৭-৮। তবে নতুন ১১টি উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্য, অর্থায়ন কাঠামো ও সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। 
বিমানের এই বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিবহনে সংস্থাটির সমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এর মধ্যে ৭৮৭-১০ মূলত বেশি যাত্রী ধারণমতার ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ হিসেবে দীর্ঘ ও উচ্চ চাহিদার আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহার করা হবে। অন্য দিকে ৭৩৭-৮ একক-আইল উড়োজাহাজ হিসেবে আঞ্চলিক ও মধ্যম দূরত্বের রুটে ব্যবহারের উপযোগী।
জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রত্যাশা : বোয়িংয়ের দাবি, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭ ম্যাক্স পরিবার আগের প্রজন্মের সমজাতীয় উড়োজাহাজের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। ফলে নতুন উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহর আধুনিকায়নের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। 
বোয়িং জানিয়েছে, ৭৩৭-৮ বিমানের বিদ্যমান একক-আইল বহরের সাথে পরিচালনাগত সামঞ্জস্য তৈরি করবে এবং তুলনামূলক বেশি দূরত্বে উড়তে সম হবে। আর ৭৮৭-১০ বিমানের বর্তমান ৭৮৭-৮ ও ৭৮৭-৯ বহরের সাথে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক রুটে অতিরিক্ত আসন সমতা তৈরি করবে। একই ধরনের উড়োজাহাজের বহর বাড়ায় পাইলট প্রশিণ, রণাবেণ ও পরিচালন ব্যবস্থাপনাতেও কিছু সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 
বর্তমান বহর ১৯টির : বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে বোয়িংয়ের ৭৮৭, ৭৭৭ ও ৭৩৭ নেক্সট-জেনারেশন উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে বিমানের বহরে রয়েছে কানাডার তৈরি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। 
নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার আগে থেকেই বিমানের বহর সম্প্রসারণের বড় পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এপ্রিলের ১৪টি বোয়িংয়ের পর এবার আরো ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি হলো। এর পাশাপাশি ১০টি এয়ারবাস কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও নিয়ে ওই প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে বিমানের ভবিষ্যৎ ক্রয়-তালিকায় মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ থাকতে পারেÑ ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস। 
বিমানের বহর সম্প্রসারণের সাথে ঢাকার হজরত শাহজালাল (রহ:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সমতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়লেও সেগুলো লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সøট, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রণাবেণ সমতা, প্রশিতি জনবল এবং আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক কৌশল প্রয়োজন হবে।
এ দিকে বিমানের নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়ের আর্থিক দায় ও অর্থায়ন কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে থাকবে। বিশেষ করে সর্বশেষ ১১টি উড়োজাহাজের মূল্য, ঋণ বা লিজের শর্ত, সুদের হার, ডেলিভারি সূচি এবং রুটভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিনিয়োগের সামগ্রিক আর্থিক প্রভাব নিরূপণ করা কঠিন। এ কারণে নতুন বহরকে লাভজনকভাবে কাজে লাগাতে রুট নির্বাচন, যাত্রী চাহিদা ও পরিচালন দতার ওপর জোর দেয়ার প্রয়োজন হবে।