নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রায় ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐক্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস কাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমাদের ফরেন পলিসি আমরা নিজেরা করতে পারি। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রা করতে হলে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐক্য ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং বজায় রাখতে হবে। এর মাধ্যমে স্বৈরাচারের পুনরুত্থান ঠেকাতে হবে এবং বাংলাদেশ যাতে আর কখনো কোনো রাষ্ট্রের পিছনের উঠান না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রিজভী বলেন, ইতিহাসে হিটলার বা মুসোলিনির মতো স্বৈরাচারদের সমর্থনে যেমন এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী কাজ করেছে, বাংলাদেশেও শাহরিয়ার কবির বা আবেদ খানের মতো সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা ফ্যাসিবাদের পে অবস্থান নিয়ে ‘চেতনার বয়ান’ তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা নিজের অপকর্ম আড়াল করতে মুক্তিযুদ্ধকে পণ্যের মতো ব্যবহার করেছেন। রণাঙ্গনের যোদ্ধা ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও রুহুল আমিন গাজীকে জেলে রেখে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১৬-১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তাঘাট ও মাঠঘাট যখন অবরুদ্ধ ছিল, তখন জাতীয় প্রেস কাবে আন্দোলনের কিছু ‘স্পেস’ পাওয়া যেত। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীর খোঁজখবর নিতেন এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থানকে গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করতেন।
রাজনৈতিক ভাষার শালীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে রাজনৈতিক আলোচনা বা সমালোচনা কঠোর হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ‘তুই-তোকারি’ করা ফ্যাসিবাদের কালচার।
দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে রিজভী বলেন, ‘চার দিকে মীর্জাফর ও জল্লাদরা অপতৎপরতা চালাচ্ছে।’ ‘ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এর সূত্রের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে বোমাবাজির নির্দেশনা দেয়া এবং ছবি তুলে পাঠালে অর্থ পরিশোধের মতো চক্রান্ত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সরকার ও বিরোধী দল একটি রাষ্ট্রের দু’টি চোখ ও দু’টি হাতের মতো। পরস্পরের সহযোগিতা, সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধ না থাকলে একটি জাতি আবারো সঙ্কট ও সমস্যার মধ্যে পড়তে পারে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় পারস্পরিক দায়িত্বশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের হাতে যে মতা থাকে, তা যেন যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ না হয়, সে জন্য মতার অপব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যখনই কোনো অন্যায় আমরা দেখব, অবিচার দেখব, অব্যবস্থাপনা দেখব, কোনো এমন আইন দেখব যেটি সাংবাদিকদের জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য অকল্যাণকরÑ সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব, প্রতিবাদী হবো।  তিনি আরো বলেন, ‘সমালোচনা আমাদের থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু দেশকে এগিয়ে নেয়ার েেত্র, মানুষের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে, দেশের স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বকে রার ব্যাপারে আমরা এক থাকব ইনশাআল্লাহ।’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, আমরা আইনের শাসনের প,ে আমরা মানবিক শাসনের প।ে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই। এবং এেেত্র সাংবাদিকদের আমি আবারো বলব যে, আপনাদের দুঃসাহসী ভূমিকা প্রয়োজন।
রুহুল আমিন গাজীর স্মৃতিচারণ করে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে তিনি একজন কৃতিত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক ও সহকর্মীদের কষ্ট-বেদনা লাঘব এবং তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে তিনি কাজ করেছেন। অনেকেই যখন কথা বলতে পারেননি, তখন তিনি দৃঢ় ও বলিষ্ঠভাবে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, সত্য কথা বলা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা রাখার েেত্র হাতেগোনা যে কয়েকজন সাংবাদিক দুঃসাহসিক ভূমিকা রেখেছেন, রুহুল আমিন গাজী তাদের অন্যতম। সাংবাদিকদের এমন ভূমিকা জাতিকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছে।
একই সময়ে সাংবাদিকদের একটি অংশের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, রুহুল আমিন গাজীর কিছু সহকর্মী সাংবাদিক ফ্যাসিবাদের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। সাংবাদিকদের একটি অংশ ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করার েেত্র ভূমিকা রেখেছেন। সাংবাদিকরা সঠিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশের এত বড় তি হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্মরণসভায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, রুহুল আমিন গাজী সাংবাদিকদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে ঐক্যের সেতুবন্ধ তৈরি করেছিলেন। দলীয় কিংবা স্বার্থের দ্বন্দ্বে বিভেদ-বিসংবাদ তৈরি হলেও তিনি সবসময় ঐক্যের সেতুবন্ধ রচনার চেষ্টা করেছেন।
রুহুল আমিন গাজীর কারাবরণ ও চিকিৎসার প্রসঙ্গ তুলে শহিদুল ইসলাম বলেন, তাকে দীর্ঘ দিন জেলে রাখা হয়েছে। তার একটি কিডনি অপারেশন করে ফেলে দেয়া হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার সময় তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শহীন বলেন, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে রুহুল আমিন গাজীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন একটি মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। তিনি বলেন, রুহুল আমিন গাজী আজীবন সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পেশাজীবনের শুরু থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করেছেন। তিনি আরো বলেন, রুহুল আমিন গাজী বেঁচে থাকলে সাংবাদিকদের সাথে বর্তমান পরিস্থিতিতে যেসব কাজ করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে তিনি সোচ্চার থাকতেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন ডিইউজের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল বাছির (বাছির জামাল)। এ ছাড়া নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী ও যুগ্ম বার্তাসম্পাদক খায়রুল বাসারসহ বিএফইউজে ও ডিইউজের নেতৃবৃন্দসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।