গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিএনপি’র নবগঠিত উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিরোধের জের ধরে মামলা, গ্রেফতার ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। এতে জেলার সার্বিক বিএনপি’র রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরো বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মন্তব্য করছেন দলটির সাধারণ কর্মীরা।
এদিকে নতুন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ, মামলা, গ্রেফতার ও অবশেষে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্যে এসেছে। এছাড়া জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের ভুল সিদ্ধান্তে দলকে জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনেও চরম মূল্য দিতে হতে পারে বলে মন্তব্য করছেন কেউ কেউ।
জানা যায়, গত রোববার (১৫ জুন) সাহেববাজার বাইপাস এলাকায় আহ্বায়ক কমিটিকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পরদিন সোমবার বিকেলে থানায় মামলা করা হয়। পরে মামলার প্রধান আসামি উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ আহমেদকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পলানপাড়া এলাকার বাসিন্দা বিএনপিকর্মী রিপন মিয়া এ মামলা করেন। মামলায় পারভেজ আহমেদসহ ছয়জনকে নাম উল্লেখ করে এবং ২০-৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, রোববার দুপুরে নতুন কমিটির পক্ষ থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের হলে সাহেববাজার এলাকায় পৌঁছার পর পারভেজ আহমেদ ও তার অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালান। এ সময় তারা ককটেল বিস্ফোরণসহ রামদা, চাপাতি, রড ও ছুরি নিয়ে মিছিলে হামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার দিন (রোববার) রাতেই কালিয়াকৈর থানা ও ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেফতার করা হয় বিএনপির সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন ও পারভেজ আহমেদকে। এদিকে হেলালকে পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেয়া হলেও পারভেজ আহমেদকে মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তবে শুনানি না হওয়ায় বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে মামলার প্রতিবাদে সোমবার বেলা ৪টার দিকে সাহেববাজারে বিক্ষোভ সমাবেশ করে উপজেলা বিএনপির একটি অংশ।
সমাবেশে সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এই কমিটিতে ৮–১০ জন আওয়ামী লীগপন্থি ঢুকেছে। আমাদের মতো ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দেয়া হয়েছে। মামলার আসামিরা আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনের সৈনিক, অন্যদিকে যারা মামলা করেছে তারা হাইব্রিড।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি’র স্থানীয় একাধিক সিনিয়র নেতা বলেন, আমরা দলীয় সিদ্ধান্ত ও শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী। কিন্তু ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে যেভাবে কমিটি করা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাকে বহিষ্কার করা হয়েছে সেই পারভেজ বিএনপি’র একজন পরীক্ষিত নেতা। গত ১৫ বছর আন্দোলন সংগ্রামে সে সবসময় মাঠে সক্রিয় ছিল। বিগত সময়ে আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার জেল-জুলুমেরও শিকার হয়েছে। এছাড়া কালিয়াকৈর বিএনপিকে সক্রিয় রেখে মাঠপর্যায়ে আন্দোলনকে ধরে রাখতে তার দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপি’র অপর এক নেতা বলেন , স্বৈরাচার হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় যারা রাজপথে সক্রিয় ছিল ও অত্যাচারের শিকার হয়েছে, স্বৈরাচারের পতনের পরও নিজ দলের নেতাকর্মীদের মামলায় এখনো দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা জেল, জুলুমের শিকার হবে এটা মেনে নেয়া যায় না।
এদিকে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সন্ধ্যায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পারভেজ আহমেদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দলে কোন্দল ও সঙ্ঘাত সৃষ্টির পাশাপাশি আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে পারভেজ আহমেদকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো।
বিভেদ ও সংঘর্ষের ঘটনায় গাজীপুর জেলা বিএনপির প্রতিক্রিয়া জানতে আহ্বায়ক এ কে এম ফজলুল হক ও যুগ্ম-আহ্বায়ক এস এম রফিকুল ইসলামকে মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।
বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মান্নান বলেন, ‘মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’



