ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা
এক ফসলের নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে নীলফামারীর ডিমলার কৃষি। গত তিন বছরে উপজেলায় ভুট্টার আবাদই বেড়েছে ৪৫০ হেক্টর। একই সময়ে সরিষার আবাদ বেড়েছে ১৪০, বোরো ১২০, তরমুজ ৪৯ এবং আউশ ৩৫ হেক্টর। ফসলের ধরনে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের প্রবণতাও বেড়েছে। এ সময়ে উপজেলার ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ।

উপজেলা কৃষি বিভাগের ফসলভিত্তিক আবাদ তথ্য থেকে এসব চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, বর্তমানে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি ভুট্টা চাষে কৃষকের লাভ প্রায় ২৫ হাজার টাকা। ধানে প্রায় ১২ হাজার এবং সরিষায় প্রায় ১০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে।

গয়াবাড়ী ইউনিয়নের মতির বাজার এলাকার কৃষক মানিক মিয়া (৪০) বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকায় ধানই বেশি চাষ হতো। এখন জমির ধরন ও মৌসুম বুঝে ভুট্টা, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছি। এতে এক ধরনের ফসলের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে।’

নাউতারা বাজার এলাকার কৃষক সেলিম (৩০) বলেন, ‘সার কতটুকু দিতে হবে, কখন দিতে হবে এবং ফসলের পরিচর্যা কীভাবে করতে হবে এসব বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ পাই। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করতে গিয়ে এসব পরামর্শ কাজে লাগছে।’

তিস্তা চরের কৃষক জালাল উদ্দিন (৩৩) বলেন, ‘চরের জমিতে ভুট্টার পাশাপাশি কুমড়া ও মিষ্টি তরমুজও ভালো হয়। এসব ফসল চরাঞ্চলের জমি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাতের ব্যবস্থা আরও ভালো হলে কৃষকের সুবিধা হবে।’

কৃষকদের আধুনিক কৃষির সাথে যুক্ত করতে প্রশিক্ষণ, মাঠ পরিদর্শন, প্রদর্শনী, প্রণোদনা ও কৃষক মাঠ স্কুল পরিচালনা করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সুষম সার প্রয়োগেও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

সারের সরবরাহ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে। গত অর্থবছর (২০২৫-২৬) ডিমলা উপজেলায় সব ধরনের সার মিলিয়ে বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। একই পরিমাণ সার সরবরাহ পাওয়া গেছে। চলতি সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসে বিভিন্ন ধরনের সার মিলে মজুত রয়েছে ৪৫০ টন। এসব সার বিতরণের জন্য ডিলার রয়েছেন ৩২ জন।

তবে কৃষির সামনে রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে না পারা, ভুট্টার জন্য ফিড মিলের প্রয়োজনীয়তা এবং বন্যা প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘চলতি সেপ্টেম্বর মাসে স্বউদ্যোগে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৯০টি ওয়ার্ডে সুষম সার ব্যবহার ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ বিষয়ে কৃষক সমাবেশ করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারে আরও সচেতন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি ইউনিয়ন থেকে কমপক্ষে ১০ জন করে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মাধ্যমে ডিমলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বেসরকারি পর্যায়ে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে উৎপাদন ও বহুমুখী চাষ আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।’