পাবলিক পরীক্ষার সময় কোচিং সেন্টার খোলা রাখতে সরকারের অনুমতি চেয়েছেন মালিকদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব শ্যাডো এডুকেশন বাংলাদেশ (অ্যাসেব)। রোববার সকালে ফার্মগেটস্থ সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ সরকারের নিকট এই দাবি জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফ্রিল্যান্সারদের দ্বারা পরিচালিত কোচিং সেন্টারের মালিকরা লিখিত বক্তব্যে বলেন, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি নীতিমালার আওতায় এনে কোচিং সেন্টার বা ছায়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় সহায়তা করার পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষার সময়েও খোলা রাখতে সরকারের অনুমতি চান তারা।
অ্যাসেব’র নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশংকায় গত দুই বছর যাবৎ পাবলিক পরীক্ষার সময় একযোগে সব কোচিং সেন্টার বা ছায়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে সরকার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে। কিন্তু কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ রাখার পরেও দেখা গেছে প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস থেমে থাকেনি। যদিও পরবর্তীতে সরকারের কিছু সংস্কারমূলক কার্যক্রমের কারণে প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব হয়েছে। সরকারের সংস্কারমূলক উদ্যোগের মধ্যে ছিল প্রশ্নপত্র পরিবহনের সময়ে গাড়িতে নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের উপস্থিতি, প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের কাজে কাগজের প্যাকেটের পরিবর্তে ফয়েল প্যাকেটের ব্যবস্থা, পরীক্ষার কেন্দ্রে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ, পরীক্ষা শুরুর একঘন্টা আগে পরীক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ করানো ইত্যাদি। অর্থাৎ কোচিং সেন্টার খোলা বা বন্ধ নয় সরকারের এসব উদ্যোগ নেয়ার কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ কথা আজ প্রমাণিত সত্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে কোচিং সেন্টারগুলো কোনোভাবেই জড়িত নয়। ব্যবস্থাপনার উন্নয়ণ হলেই প্রশ্নপত্র ফাঁসও বন্ধ হবে।
অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সারদের দ্বারা পরিচালিত কোচিং সেন্টার খোলা রাখলেও এর সাথে জড়িত শিক্ষক বা কর্মকর্তারা কেউই কোনোভাবে প্রশ্ন মূদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহন বা বিতরণের সাথে জড়িত নন। কাজেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে আমাদের কোচিং সেন্টার মালিকদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অ্যাসেব’র আহবায়ক মো: ইমাদুল হক (ই হক)। এসময় উপস্থিত ছিলেন, অ্যাসেব’র যুগ্ন আহবায়ক শামসেয়ারা খান ডলি, আকমল হোসেন, মাহবুব আরেফিন, পলাশ সরকার প্রমূখ।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের যুগ্ম-আহবায়ক মাহমুদুল হক বলেন, আমরা কোর্চিং সেন্টার পরিচালনা করেই প্রত্যেকেই সরকারকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব দিচ্ছি। কিন্তু একটি নীতিমালার অভাবে আমরা কোচিং সেন্টার বা ছায়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একটি কাঠামোতে নিয়ে এসে পরিচালনা করতে পারছি না। আমরা সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে চাই। আমরা সরকারের কাছে দাবি করছি যাতে পাবলিক পরীক্ষার সময়ে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ রাখার যে নিষেধাজ্ঞা আছে সেটি প্রত্যাহার করে নিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্য কমিয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই সব সময়ে কোচিং সেন্টার খোলা রাখার অনুমতি দেয়া হয়।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর দেয়া রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে বিভিন্ন সময়ে মোট ১৯০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু এদের একজনও কিন্তু কোনো কোচিং সেন্টারের সাথে জড়িত ছিলেন না। পিইসি বা জেএসসি অথবা এসএসসি বা এইচএসসি’র মতো পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে ব্যাংক নিয়োগ কোচিং, ভর্তি কোচিং, ল্যাংগুয়েজ লার্নিং কোর্স কোচিং বা বিসিএস’র মতো প্রতিযোগিতামূলক কোচিং বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনা করারও দাবি করেন তিনি। একই সাথে এটা সহজে অনুমেয় যে, ফ্রিল্যান্সারদাদের দ্বারা পরিচালিত কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার সাথে প্রশ্নফাঁস হওয়ার ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই।
অ্যাসেব’র এই নেতা সাংবাদিক সম্মেলনে তার নিজস্ব একটি বিশ্লেষণও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা চলার সময়ে দেশের সব কোচিং সেন্টার বন্ধ ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ঐ বছরও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। আবার একই বছরে সরকার বেশি কিছু উদ্যোগ নেয়ার কারণে এইচএসসি পরীক্ষাতে কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে পিইসি পরীক্ষার সময়ে কোচিং সেন্টারগুলো খোলা ছিল, কিন্তু এবছরও কোনো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। কাজেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করার জন্য অনেক উপায় আছে। কোচিং সেন্টার বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। আবার প্রশ্ন ফাঁসের জন্য অনেক সময় ফেজবুক ব্যবহারকারীকে দায়ী করা হয়। কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকলেও ফেজবুক কিন্তু বন্ধ করা যায় না। কাজেই এই যুক্তিতেও কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার কোনো কারণ দেখছি না। যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নিলাম কেউ কোনো অপরাধ করলো, তাই বলে একজনের অপরাধে সবাইকে শাস্তি দেয়াটাও বোধ হয় সঠিক বিচার হবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি সরকারের নির্বাহী আদেশে পাবলিক পরীক্ষার সময়ে সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতেই সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছেন অ্যাসেব’র নেতৃবৃন্দ। নেতৃবৃন্দ তাদের এসব দাবি সংবলিত একটি আবেদন খুব শিগগিরই সরকারের কাছে পাঠাবেন বলেও জানান।



