নেই সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, লঞ্চ কর্মচারীদের হাঁকডাক করে লক্ষে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে দৈত্যকার লঞ্চগুলো, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত যাত্রী। রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা।
এক বছর আগের সদরঘাটের দৃশ্য ছিল অন্যরকম। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের যাতায়াতের একমাত্র স্বস্তির মাধ্যম ছিল লঞ্চ । প্রতিদিন যাত্রীর ভিড়ে মুখরিত থাকত সদরঘাট। কিন্তু পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পর থেকে এই ব্যস্ততম নদীপথের দৃশ্যই পাল্টে গেছে ।
সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলে নৌ চলাচলের রুট রয়েছে ৪১টি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর মতে, আগে স্বাভাবিক সময়ে ৮৫ থেকে ৯০টি লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করত। পদ্মাসেতু চালুর পর থেকে নিয়মিত চলাচলকারী লঞ্চ কমেছে ২৫টির মতো। ইতোমধ্যে যাত্রী স্বল্পতার কারণে নৌপথের অন্তত ১০টি রুটের লঞ্চ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
বিষয়টির সাথে পরিচিত লোকজনরা জানায়, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মাসেতু উদ্বোধন করা হয়। সেতু চালুর পর ঢাকার সাথে উপকূলীয় জনপদসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আধুনিক ও আরামদায়ক হয়েছে। মানুষ সড়কপথে স্বল্প সময়ে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করতে পারছে। এ কারণে ঢাকা ও বৃহত্তর বরিশালের মধ্যে নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং লঞ্চের যাত্রী কমে গেছে। এখন সড়কপথে বাসে দ্রুত ঢাকা থেকে দক্ষিণা লঞ্চে যাওয়া যায় (ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়া যায় তিন-চার ঘণ্টায়)। ফলে কম সময়ে বাড়ি ফিরতে এবং পণ্য পরিবহনে সড়কপথ বেছে নিয়েছে যাত্রীরা।
সম্প্রতি এক ছুটির দিন সকালে সদরঘাট লক্ষ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, লঞ্চকর্মীরা যাত্রী সংগ্রহে হাঁকডাক দিচ্ছে। তবে তা আগের মতো জোরাল নয়। আবার যাত্রী সংখ্যাও খুব কম। কিন্তু আছে।
ব্যাগ হাতে ঝালকাঠি যাবেন ইউসুফ আহমেদ। তিনি জানান, ‘লঞ্চ ঘাট থেকে আমার বাড়ি অনেক কাছে হওয়ায় আমি এখনো লঞ্চেই যাতায়াত করি। আগের চেয়ে ভিড় অনেক কম হওয়ায় লঞ্চে যাতায়াত করেই স্বাছন্দ্যবোধ করি।’
লক্ষ শ্রমিক লিয়াকত আলী জানান, ঘাটে আগের মতো যাত্রী নেই, বড় বড় লঞ্চের কেবিনগুলোর বেশির ভাগই ফাঁকা পড়ে থাকে। ডেকে মোটামুটি অর্ধেক যাত্রী হলেই লঞ্চ ঘাট ছেড়ে যায়। এ অবস্থায় লঞ্চে নিয়োজিত শ্রমিকদের অনেককে ছাঁটাই করা হয়েছে। আর যারা এখনো আছে, তাদেরও আগের মতো রোজগার নেই।
লক্ষ মালিকেরা জানান, পদ্মসেতু চালুর আগে প্রতিদিন ঢাকা থেকে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ লঞ্চে যাতায়াত করত। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা কমে অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। এখন লঞ্চের ভাড়া কমিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত যাত্রী। যেমন ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চের ডেকের ভাড়া ৪৩১ টাকা। তবে এখন যাত্রী নেয়া হয় ৩০০ টাকায় বা তার কমে। তিন হাজার ৫০০ টাকার ডাবল কেবিনের ভাড়া এক হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যায়।
লঞ্চের মালিকরা দাবি করেন, যাত্রী কমে যাওয়ায় তাদের ব্যবসা মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে।
শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) এক জরিপে দেখা গেছে, পদ্মাসেতু চালুর পর গত এক বছরে ঢাকার লঞ্চ যাত্রী কমেছে ৩৪ ভাগ। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবসায় মন্দার কারণে মালিকরা এক বছরে অন্তত ২০টি লঞ্চ স্ক্র্যাপ (ভেঙে যন্ত্রাংশসহ লোহালক্কড় বিক্রি) করে ফেলেছেন। এ ছাড়া আরো অন্তত ছয়টি লঞ্চ স্ক্র্যাপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকেরা পদ্মা সেতুর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং ঢাকার যানজটকেও এ অবস্থার জন্য দায়ী করছেন।
জবি শিক্ষার্থী শারমিন নাহার জানান, ‘লঞ্চে ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সময় লাগে ৯ ঘণ্টার বেশি। পুরান ঢাকার জ্যাম ঠেলে সদরঘাট যাওয়ার দুর্ভোগ ও অনেক। কিন্তু এখন বাসে পদ্মাসেতু দিয়ে বাড়ি ফিরতে কম সময় লাগে এ কারণে বাসে নিয়মিত যাতায়াত করছি।’
অন্যদিকে পটুয়াখালীর যাত্রী নিয়াজ আহমেদ জানান, ‘আগের তুলনায় লঞ্চ যাত্রা অনেক আরামদায়ক হয়েছে। বাসের থেকে লঞ্চের ডেকে ভাড়া অনেক কম, তাছাড়া এত টাকা দিয়ে বাসে যাওয়া আমাদের পোষায় না।’
গত দুই ঈদের ছুটিতে লঞ্চে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় না থাকলেও যাত্রী চাপ ছিল। আসন্ন শারদীয় দুর্গা পূজার ছুটিতে সদরঘাটে লঞ্চ যাত্রীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকেরা।



