বিশ্বের একটি বড় সংকট কীভাবে অন্য চলমান সংকটের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি স্পষ্ট প্রমাণ ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা। হামলা বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে গিয়ে সে দেশ থেকে পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও কয়লা আমদানি বন্ধ বা সীমিত করার পথে যেতে চায় পশ্চিমা জগৎ।

কিন্তু নিজস্ব অর্থনীতির স্বার্থে সরবরাহের বিকল্প পথ ছাড়াই এমন চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেই সহজ নয়। এই লক্ষ্যে তেলের জন্য বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে পশ্চিমা দেশগুলো।

পেট্রোলিয়ামের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস হিসেবে এবার নজর পড়েছে একঘরে হয়ে থাকা দুই দেশের ওপর। বহু বছরের নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম বাজার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ও লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলা।

দ্রুত আপোশের মাধ্যমে এই দুই দেশ থেকে আবার তেল আমদানি সম্ভব করার জন্য আগ্রহ বাড়ছে পশ্চিমের দেশগুলোর।

অপরদিকে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের সাথেও রাজনৈতিক স্তরে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে আসছিলো। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথেও আপোসে যাওয়ার কথা ভাবছে ওয়াশিংটন।

তবে এমন প্রচেষ্টার ঝুঁকিও কম নয়। কারণ এই তিন দেশের সাথেই রাশিয়ার যথেষ্ট নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে৷

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বুধবার বলেন, কূটনৈতিক পথে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমুখী স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মূল্যবোধের রাজনীতির যে অঙ্গীকার করেছিলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা আপাতত ধামাচাপা রাখার ইঙ্গিত দিলেন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী৷

এমন বাড়তি গুরুত্ব পেয়ে বিশেষ করে ইরান ও ভেনেজুয়েলা আরো ছাড় আদায় করার চেষ্টা করবে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

ভিয়েনায় পরমাণু চুক্তির নতুন সংস্করণের লক্ষ্যে আলোচনার শেষ পর্যায়ে ইরানের দাবি উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে৷ ভেনেজুয়েলার মাদুরো প্রশাসনও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনায় যতটা সম্ভব সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালাতে পারে।

ভেনেজুয়েলা সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে ইতোমধ্যেই দুই মার্কিন বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে এবং বিরোধী পক্ষের সাথে সংলাপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে এই দুই দেশের সাথে দ্রুত রফা সম্ভব হলেও আবার যথেষ্ট পরিমাণ অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম উৎপাদন করতে কিছুটা সময় লাগবে।

সৌদি আরবের যুবরাজের সাথে সম্পর্কের উন্নতির বিষয়টি আরো জটিল। মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে পুতিনের সুসম্পর্কের ভিত্তিতে বিশ্বের পেট্রোলিয়াম বাজারের ওপর আরো নিয়ন্ত্রণ পেয়েছেন। করোনা সংকট কমে যাওয়ার পরেও বাড়তি চাহিদা মেটাতে তিনি মোটেই উৎপাদন বাড়ানোর পথে যাননি।

বর্তমানে ইউক্রেন সংকটের ফলে ঘাটতি দূর করতে সে দেশ ইচ্ছা করলেই উৎপাদন বাড়াতে পারে৷ কিন্তু সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশগজির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মোহাম্মদ বিন সালমান মোটেই সেই পথে এগোচ্ছেন না। অপরদিকে
বাইডেন প্রশাসন তাকে ‘হারানো মর্যাদা' ফিরিয়ে দিলে তিনি তেলের ঘাটতি মেটাতে রাজি হবেন কিনা, সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ সম্প্রতি তিনি বাইডেনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতেও আগ্রহ দেখাননি বলে সংবাদ মাধ্যমের একাংশে দাবি করা হয়েছে৷

বাইডেন প্রশাসনও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রবল চাপের মুখে পড়তে পারে৷ বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে আপোশের প্রশ্নে দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেই যথেষ্ট প্রতিরোধ কাজ করছে৷ তার নিজের ডেমোক্র্যাটিক দলে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে আপোসের যথেষ্ট বিরোধিতা কাজ করছে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ বাইডেনের জন্যও সহজ হবে না।

সূত্র : ডয়চে ভেলে