গাজার ওপর ইসরায়েলের আরোপিত অবৈধ অবরোধ চূড়ান্তভাবে ভাঙার পরিকল্পনা করছে হামাস। গাজার নির্বাচিত এই শাসক গোষ্ঠীটির এক ঊর্ধ্বতন নেতা শনিবার একথা জানিয়েছেন। শনিবার ফিলিস্তিনিদের চলমান গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন কর্মসূচিতে রাখা বক্তব্যে হামাস নেতা হোসাম বাদরান বলেছেন, ‘এই কর্মসূচি আমাদের গর্বিত করেছে। এই অবরোধ ভাঙার জন্য যা প্রয়োজন তার মূল্য দেবে হামাস।’
২০০৭ সালে গাজার ক্ষমতায় আসে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। মূলত এরপর থেকেই গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল ও মিসর। তখন থেকে রাফা সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষ। বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তারা। ওই অবরোধ ভাঙার পরিকল্পনার কথা বলেছেন হোসাম বাদরান। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তারা যা দখল করে নিয়েছে তা ফিরে পাওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে।
হোসাম বাদরান বলেন, আমাদের জনগণ কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না। ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক ভূমির প্রতিটি ইঞ্চির স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত কখনোই আমরা সাদা পতাকা ওড়াবো না।
নির্বাসনে থাকা বাদরান বৃহস্পতিবার গাজায় পৌঁছান। আন্তর্জাতিক হামাস নেতাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ মীমাংসার অংশ হিসেবে তিনি গাজায় আসেন। ইসরায়েল ও প্রতিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আরো পড়ুন: আহেদ তামিমি, প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রতীক
ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের আইকনে পরিণত হয়েছেন ১৭ বছর বয়সী আহেদ তামিমি। রোববার ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন এই প্রতিবাদী কিশোরী। গত ডিসেম্বরে ইসরাইলি সেনাদের থাপ্পর মারার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো।
বাড়ি থেকে তামিমির ভাইকে ধরে নিতে এলে তামিম ইসরাইলি বাহিনীকে বাধা দেয়, এক পর্যায়ে তাকে বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করলে এক সেনাকে থাপ্পর মারে তামিমি। গত মার্চে বিচার শেষে তামিমিকে ৮ মাসের কারদণ্ড দিয়েছিলো ইসরাইলি আদালত।
২০০১ সালের ৩১ জানুয়ারি পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরের নবী সালেহ এলাকায় জন্ম আহেদ তামিমির। তামিমির জন্মই হয়েছে এমন একটি পরিবারে, যারা সর্বদা ইসরাইলি আগ্রসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনে জড়িত। তাই শিশু বয়স থেকেই তামিমি জড়িত হয়েছেন আগ্রাসনবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। ইসরইলি সেনাদের বিরুদ্ধে সেই শিশুকাল থেকেই নিয়মিত বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন তামিমি। তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়।
তামিমির বাবা, মা ও ভাইয়েরা অনেক বার আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন ইসরাইলি বাহিনীর হাতে। তামিমির চাচা রুশদি আল তামিমি ২০১২ সালে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার ফুফু বাসিমা আল তামিমি ১৯৯৩ সালে ইসরাইলি পুলিশের পিটুনিতে নিহত হয়েছে। ঠিক সেই সময়ই ইসরাইলি আদালতে বিচার চলছিলো সেই ফুফুর ছেলের।
স্কুল জীবন থেকেই তামিমি নিয়মিত ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিতে থাকে। অসীম সাহসী ভুমিকার কারণে প্রতিরোধ আন্দোলনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে সে। প্রকাশ্যে ইসরাইলি সেনা ও পুলিশের সাথে তর্ক করা, খুব কাছ থেকে তাদের ওপর পাথর ছুড়ে মারা এমনকি ঘুষি মারার মতো দুঃসাহসিক কাজ করে আলোচনার জন্ম দেয়।
শৈশবে আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো কাটেনি আহেদ তামিমির। ফিলিস্তিনি শিশুদের যেটি প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করতে হয়, সেই গুলি, বোমার মধ্যেই কেটেছে তার শৈশব। আহেদ তামিমির চাচা নাজি আল তামিমি বলেন, ‘নিয়মিত এসব বিক্ষোভ-সংঘাতের মুখোমুখি হতেন আহেদ। রাবার বুলেট, টিয়ারগ্যাসে আহতও হয়েছে সে। শৈশবেই দেখেছে বাবা, মায়ের গ্রেফতার, প্রত্যক্ষ করেছে চাচা ও ফুফুর শাহাদাৎবরণ’।
দেশে ও দেশের বাইরেও বিভিন্ন ইসরাইলী আগ্রাসন বিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তামিমি। বিশেষ করে তুরস্ক, ফ্রান্স ও দক্ষিণ আফ্রিকায়। এবারের গ্রেফতারের পর সারা বিশ্বেই আলোচিত চরিত্র হয়ে ওঠেন তামিমি। ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ প্রতিবাদ সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন ধূসর চুলের এই কিশোরী।
সম্প্রতি আহেদ তামিমির আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ফিলিস্তিনি শহর বেথলেহেমে গ্রিফিতি অঙ্কণ করায় দুই ইতালীয় আর্টিস্টকে গ্রেফতার করেছে ইসরাইল। ২০১২ সালে তামিমিকে সাহসিকতা পুরস্কার দেয় তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বাসাকশেইর পৌর কর্তৃপক্ষ। সোমবার জেল থেকে মুক্তি পেয়ে, আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তামিমি।






