ভূমিকা : গল্প নয়, বাস্তব এক পতনের ইতিহাস
২০২৫ সালের মে মাস। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তপ্ত কূটনৈতিক আবহে হঠাৎই ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমানের গর্জন আকাশ কাঁপিয়ে ওঠে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামক এক সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার দৃশ্যপট সাজানো ছিল পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে। কিন্তু সেই অপারেশন কতটা সফল ছিল, তা নিয়ে আজ প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলজুড়ে। ভারতের যেসব রাফাল বিমানকে সামরিক আধুনিকীকরণের মুকুটমণি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি পাল্টা আক্রমণে গুঁড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ২০ জুলাই ২০২৫ এ নিয়ে বিস্তরিত লিখেছেন হাম্মাদ সরফরাজ।
কিন্তু সামরিক ব্যর্থতার স্বীকারোক্তির বদলে নয়াদিল্লি বেছে নেয় এক ভিন্ন কক্ষপথ, গল্প তৈরির। ধোঁয়াটে ব্যাখ্যা, অতিনাটকীয় কল্পনা আর বিদেশী ষড়যন্ত্রের ছায়া মিশিয়ে শুরু হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’–এর এক নতুন সংস্করণ রচনা। নয়াদিল্লির তৈরি বলিউডের চিত্রনাট্য! এআই দিয়ে তৈরি হতে পারে গা ছমে ছমে চলচ্চিত্র। ‘প্রগতিশীল পরিবারের সব সদস্য নিয়ে দেখাও উপযোগী নাচে-গানে-আবেদনে-কান্নায়, প্রেমরসে এবং বীররসে ভরপুর ফুল ফাইটিং রঙিন সিনেমা’ অতীতে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনে আকছার দেখা যে বাক্য তাকেই একটু যুগোপযোগী করা হলো।
তিন মুখে এক যুদ্ধ : পাকিস্তান, চীন ও তুরস্ক?
যুদ্ধের দুই মাস পর, ভারতের ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহুল আর সিংহ এক শিল্পমালিক সমাবেশে দাঁড়িয়ে দাবি করেন, এই যুদ্ধে ভারত একা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, বরং চীন ও তুরস্ককেও মোকাবেলা করেছে, যারা নেপথ্যে থেকে ইসলামাবাদকে সমর্থন যুগিয়েছে। তিনি চীনের প্রাচীন সামরিক কৌশলের বই দ্য থার্টি সিক্স স্ট্র্যা টেজেমস বা রণবিদ্যার ৩৬ কৌশল-এর একটি নীতির উদাহরণ টেনে বলেন, ‘ধার করা ছুরি দিয়ে হত্যা’- অর্থাৎ কাউকে দিয়ে পরোক্ষে শত্রুকে আঘাত করা।
তার মতে, চীন সেই কৌশলই প্রয়োগ করেছে; নিজেরা সরাসরি লড়াই না করে পাকিস্তানকে সামনে ঠেলে দিয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে।
(দ্য থার্টি সিক্স স্ট্র্যা টেজেমস বা রণবিদ্যার ৩৬ কৌশল বইটি কোনো একজন নির্দিষ্ট লেখকের লেখা নয়। এটি চীনের প্রাচীন সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ্যার একটি সংগ্রহ। ধারণা করা হয়, এই কৌশলগুলো চীনের সান জু -এর দ্য আট অব ওয়ার, ঝুং ইউয়ান রাজবংশ, তিন রাজ্যের যুগ (Three Kingdoms period) এবং মিং ও কিং রাজবংশের সময় প্রবর্তিত বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সংকলন। বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রকাশিত হয় ২০ শতকের মাঝামাঝি, তবে এর মূল ধারণাগুলো হাজার বছরের পুরনো।
এই বইয়ের কৌশলগুলো চীনা ম্যান্ডারিনে সংক্ষিপ্ত প্রবাদ আকারে লেখা হয়েছে এবং এগুলো জালিয়াতি, ধোঁকা, প্রতারণা, সময় বুঝে আঘাত, পরোক্ষ আক্রমণ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে। প্রতিটি কৌশল যুদ্ধক্ষেত্র বা রাজনৈতিক চালে প্রয়োগযোগ্য।
যেমন যে কৌশলটি ভারতীয় জেনারেল উল্লেখ করেছিলেন, ‘Kill with a borrowed knife’ অর্থাৎ ‘ধার করা ছুরি দিয়ে হত্যা করো।’ সেটি এই ৩৬ কৌশলের অন্যতম, যার মূল কথা হলো- নিজে ঝুঁকি না নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত হানা।
এমনকি দিল্লির জেনারেল দাবি করেন, ‘গত পাঁচ বছরে পাকিস্তানের ৮১ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম এসেছে চীন থেকে।’
কিন্তু বিশ্লেষকরা পাল্টা বলেন, এই যুক্তি মানলে তাহলে ভারতও ফ্রান্স ও রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করেছে, যাদের কাছ থেকে তারা রাফাল যুদ্ধবিমানসহ নানা অস্ত্র সংগ্রহ করেছে ভারত। রাফাল, ইউরোপীয় নিয়ম ভাঙা, আর বেসামরিক মৃত্যু ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমান ও তাদের সাথে থাকা এসসিএএলপি-ইজি (SCALP-EG) ক্ষেপণাস্ত্র ভারত ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালায়। এতে বহু বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্র রফতানির বিধিমালায় বলা আছে, যেকোনো অস্ত্র এমন অপব্যবহারের জন্য ব্যবহার হতে পারে, এমন আশঙ্কা থাকলে রফতানি নিষিদ্ধ। তবুও ফ্রান্স ভারতকে এই অস্ত্র সরবরাহ করেছে।
এই অস্ত্রগুলো ইইউ কমন পজিশন ২০০৮/৯৪৪/সিএফএসপি নীতির আওতায় রফতানি করা হয়। এ অনুযায়ী আটটি বাধ্যতামূলক শর্ত মেনে রফতানির লাইসেন্স দেয়। এইসব শর্ত না মানা শুধু ইইউ’র বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের সামিল।
গল্পটা বেশি জটিল, সত্য কম : হাছান আকবর
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টার -এর সাবেক পাকিস্তান ফেলো হাছান আকবর বলেন, ‘ভারতের সামরিক ব্যর্থতা ঢাকতে এভাবেই জটিল গল্প তৈরি করে পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে পাকিস্তানকে চীনা পুতুল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।’
তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যেই এই সাফল্য অর্জন করেছে, বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে আনা ফাইটার জেট, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও সেন্সর সমন্বয় করে এক নেটওয়ার্কড মাল্টি-ডোমেইন যুদ্ধ কাঠামো তৈরি করেছে। ‘ভারতের যুক্তি মানলে পাকিস্তান যেন ফ্রান্স, রাশিয়া, এমনকি ইসরাইলের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছে,’ ব্যঙ্গ করে বলেন তিনি।
ভুয়া খবর, গুজব, আর মোদি সরকারের আষাঢ়ে কাহিনি তৈরির ‘ডিপার্টমেন্ট’
ইইউ ডিসইনফো ল্যাব আগেই এক তদন্তে দেখিয়েছে, নয়াদিল্লির সাথে যুক্ত এক বিশাল ভুয়া সংবাদ নেটওয়ার্ক কাজ করছে। পাশ্চাত্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনের উদ্দেশে এই নেটওয়ার্ক বা জালকর্ম নির্মিত হয়েছে। এখন চীন ও তুরস্ককে অপারেশন সিঁদুরে জড়ানোর চেষ্টাও সেই পুরোনো ছকের পুনরাবৃত্তি, প্রচারণার পুরানো কক্ষপথে চলা।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক প্রধান ড. তালাত উইযারাত বলেন, ‘ভারতের বারবার বদলানো বয়ান তার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই শেষ করে দিচ্ছে। একদিকে তারা আঞ্চলিক শক্তি বলে দাবী করে, অন্যদিকে নিজস্ব বিবরণই ধরে রাখতে পারে না।’
মাটি থেকে বারবার মুছে যাওয়া রেখা
অপারেশন সিঁদুরের পর, ভারত যেন কেবল বালির উপর রেখা আঁকছে, যা পরদিনই ঢেউয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। সামান্য সময়ের সংঘর্ষকেই নয়াদিল্লি রূপান্তর করেছে এক ‘কৌশলগত সাফল্য’-র প্রচারণায়। যদিও রাফাল বিমান নিজেরাই ভূপতিত হয়, সেই তথ্য প্রচারে তেমন জোর দেয়া হয়নি। উল্টো বলা হয়েছে, চীন-তুরস্ক-পাকিস্তান মিলিতভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
এই গল্প বলার মাধ্যমে ভারত ঝুঁকিপূর্ণ তথ্য, বেসামরিক মৃত্যু, গোয়েন্দা ব্যর্থতা- সব চাপা দিয়ে দিয়েছে। অথচ ইউরোপীয় নীতিমালার বিরুদ্ধে যে এভাবে হিন্দুস্তান অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে প্যারিস বা ব্রাসেলসে কার্যত নীরবতা।
বিপর্যয়ের পরও মোদির ‘উল্লাস’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবরই পরিচিত ‘মঞ্চের নায়ক’ হিসেবে। রামমন্দির উদ্বোধনেও তিনিই ছিলেন প্রধান পুরোহিত, ধমীয় পুরোহিতের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। আর অপারেশন সিঁদুরের পর, যখন পুরো দেশের মিডিয়া তুমুল প্রশ্ন তুলছিল- তখনো মোদি একের পর এক নির্বাচনী সভা করছিলেন, যেন কিছুই হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে।’ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি টুইট করেন, ‘মোদিজি, পাঁচটি জেট কি সত্যিই ভেঙে পড়েছিল? ভারত জানতে চায়।’ এই ঘটনার পর দাসো অ্যাভিয়েশন- যে প্রতিষ্ঠান রাফাল নির্মাণ করে, তার শেয়ারমূল্য পড়ে যায় ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে। কেউ কেউ একে প্রতীকি পতন বলেও মন্তব্য করেছেন।
সত্যের মুখোমুখি ভারত?
সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য আসে দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে। ৭ মে ভারতের আকালিয়া কালান গ্রামে রাতে একটি রাফাল ভূপতিত হয়, দু’জন গ্রামবাসী নিহত হন। দুই পাইলট বেরিয়ে এসে আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনাটি স্বীকার করেনি, যদিও বিদেশী পর্যবেক্ষকেরা নিশ্চিত করেছেন- কমপক্ষে পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। আরো খারাপ সংবাদ আসে, পাকিস্তানের ব্যবহৃত চীনা নির্মিত জে-১০ যুদ্ধবিমান ও পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রই ভারতের রাফালকে পরাজিত করে। এমনকি বেইজিং থেকে রিয়েল টাইম গোয়েন্দা তথ্য সহায়তার কথাও উঠে আসে।
ভারতের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ক্যাপ্টেন শিভ কুমার (জাকার্তা)–এর একটি ছড়িয়ে পড়া অডিওতে তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভারতীয় বিমানসেনা পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনায় হামলা করতে পারেনি।’
উপসংহার : আত্মসমালোচনার অভাবেই আত্মবিস্মরণ
ড. তালাত উইযারাত স্পষ্ট বলেন, ‘যদি ভারত প্রকৃত সাফল্য পেত, তবে বিজয়ের ঢাক নিজেই বাজাতো। কিন্তু তারা আজও ব্যাখ্যা দিচ্ছে কেন ব্যর্থ হলো না, বরং গল্প বানিয়ে বলছে, সফল কিভাবে হয়েছিল।’
শেষ কথা বলেছিলেন হাছান আকবর, ‘ভারত মূলত নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ‘জয়ের গল্প’ বিক্রি করছে ঘরোয়া রাজনীতির বাজারে।’
আর এই গল্প বলার সময় ভারত ভুলে গেছে, প্রত্যেক অতিরঞ্জন, প্রত্যেক অর্ধসত্য, এক দিন মুখোমুখি হবে নির্মম বাস্তবের।



