ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর নানামাত্রিক নিপীড়ন বহু গুণে বেড়ে গেছে। ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, নাগরিক অধিকার হরণ করে প্রতিবেশী দেশে পুশইন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষত মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মাদরাসা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুতর— গরু জবাই, গরুর গোশত বহন ও পাচারের অভিযোগ এনে লিঞ্চিং। উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর থেকে গত এক যুগে এই প্রবণতা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। এ সময়েই দেশটির মিডিয়া ক্ষমতাসীনদের কব্জায়। তাই গণমাধ্যম এ নিয়ে খুব সমালোচনামুখর নয়। এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব খবর নিয়মমাফিক লিপিবদ্ধও করা হয় না। ফলে সাম্প্রদায়িক পীড়ন ভারতে সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
গত শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে উপর্যুপরি পিটিয়ে দুই যুবককে হত্যা করেছে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা। একটি পিকআপভ্যানে যাওয়ার সময় চার মুসলিম যুবককে তারা নিশানা করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় গরু পাচারের। এই সময় তারা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলেও নরপিশাচদের হাত থেকে রেহাই পাননি। তাদের পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়। লিঞ্চিংয়ের এসব ঘটনা মিডিয়ায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয় না। শিলিগুড়ির হত্যাকাণ্ডটি কিছু মিডিয়ায় এমনভাবে এসেছে, তাতে বোঝার উপায় নেই— উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিম যুবকদের খুন করেছে। খুনিদের পরিচয় আড়াল করা হয়েছে। গরু চুরির ঘটনা সংবাদে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। গরু চুরির অপ্রমাণিত অভিযোগে কাউকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা যে ভয়াবহ অপরাধ তার উল্লেখ নেই।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৫-১৮ সালে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাবাধীন এলাকায় শতাধিক লিঞ্চিং হয়। গরু রক্ষার নামে ২০টি রাজ্যে সংঘটিত ওই সব হামলায় ৪৪ জন প্রাণ হারান। আর ২৮০ জন গুরুতর আহত হন। এরপরও গরু রক্ষার নামে বিক্ষিপ্ত হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটছে। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, আসাম, পশ্চিমবঙ্গে বেশি ঘটছে এই নৃশংসতা। এসব প্রদেশেও সংখ্যালঘুদের প্রতিষ্ঠান নিশানা বানানো হচ্ছে। এর মধ্যে আছে মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া। মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা। বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার পর ধারবাহিকভাবে মসজিদ ধ্বংস করা হচ্ছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর ২৫২টি মাদরাসা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। আরো ১০০টিকে নোটিশ দিয়ে চাপে রাখা হয়েছে। একই প্রক্রিয়া আসামে চলছে আগে থেকেই। সেখানে এক হাজার ২৮১টি মাদরাসার নাম পরিবর্তন ও রূপান্তর করা হয়েছে। শিক্ষার সংস্কার করে জনকল্যাণমুখী করার অভিপ্রায় থেকে এমন করা হচ্ছে না। এর পেছনে আছে সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও তীব্র ধর্মীয় বিদ্বেষ।
সংখ্যালঘুদের ওপর পীড়নকারীদের দৃষ্টান্তমূলত শাস্তি হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আশকারা পায়। ভারতে এ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন ও বঞ্চনা ক্রমেই বাড়ছে। সেখানে তাদের কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে। ভারতীয় শাসকরা এর ভয়াবহ নেতিবাচক দিক অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় একসময় পুরো অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
Feature সম্পাদকীয়
গরু চুরির অভিযোগে মুসলিম হত্যা
গরু চুরির অভিযোগে মুসলিম হত্যা



