ব্যবহার বাড়লেও প্রায় ২৫ হাজার বিও হিসাব খালি
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে বিও হিসাব নতুন করে ব্যালেন্সশূন্য বা খালি হয়ে গেছে ২৪ হাজার ৭৮৩টি। তবে বিও হিসাব পরিচালনা বেড়েছে চার হাজার ২১৬টি। আর শেয়ারশূন্য হয়েছে ২০ হাজার ৪০০টি বিও।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না
- ৩ মাসে ব্যবহার বেড়েছে মাত্র ৪২১৬টি বিও
- ২০ হাজারের বেশি বিও হিসাবে কোনো শেয়ার নেই
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুঁজিবাজারের রক্তক্ষরণ আট মাসেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অন্য দিকে প্রায় কোটি বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। ঘুরে দাঁড়ানো দূরের কথা স্থিতিশীলও হতে পারছে না। অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এমন পরিস্থিতিতে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব নতুন করে ব্যালেন্সশূন্য বা খালি হয়ে গেছে ২৪ হাজার ৭৮৩টি। তবে বিও হিসাব পরিচালনা বেড়েছে চার হাজার ২১৬টি। আর শেয়ারশূন্য হয়েছে ২০ হাজার ৪০০টি বিও। বিও হিসাব ব্যবহার হচ্ছে না এমন সংখ্যা তিন মাসে এক হাজার ১২৯টি বেড়েছে বলে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে চরম অস্থিরতা ও কোনো ধরনের উন্নতি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বাজার ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
জনরোষ ও আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় গত আগস্টে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও দেশের পুঁজিবাজারে তেমন কোনো অগ্রগতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জিত হয়নি। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে প্রথমে চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং পরে চেয়ারম্যান ও জনবলের মধ্যে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি বাজারকে স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। উল্টো দর পতনের স্রোতে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ নিয়ে শঙ্কিত। তবে বিও হিসাব ব্যবহার বা অপারেটিং বিও হিসাব বেড়েছে চার হাজার ২১৬টি। বেড়েছে ব্যালেন্সশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যাও। হাসিনা সরকারের পতনের পর দিন ৬ আগস্ট ব্যালেন্সশূন্য বিও হিসাব ছিল তিন লাখ ১০ হাজার ৯১৭টি। আর জানুয়ারির প্রথম দিন ছিল তিন লাখ ৪৪ হাজার ৪২৭টি। মার্চ শেষে এই বিও হিসাব আরো ২৪ হাজার ৭৮৩টি ব্যালেন্সশূন্য বিও বেড়ে এখন তিন লাখ ৬৯ হাজার ২১০টিতে পৌঁছেছে।
ব্যবহার না হওয়া বিও হিসাব সংখ্যা তিন মাসে দেখা যায়, এক হাজার ১২৯টি বেড়ে ৬৭ হাজার ৭৮৫টিতে দাঁড়িয়েছে। ৬ আগস্ট শেয়ার আছে এমন বিও হিসাব ছিল ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৮টি। আর ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে এমন বিও সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৯টি। গত তিন মাসে শেয়ার ছেড়ে দেয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মোট ২০ হাজার ৪০০টি হিসাব শেয়ারশূন্য হওয়ায় এখন শেয়ার আছে এমন হিসাব ১২ লাখ ৫১ হাজার ১৪৯টিতে নেমেছে।
সিডিবিএলের তথ্য বলছে, সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে। বর্তমানে বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব আছে ৪৬ হাজার ৪৯৪টি। শেখ হাসিনার সরকার পতনের সময় এই সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৮৩টি। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৪৬ হাজার ৬৮৫টি অর্থাৎ বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর মধ্যে গত তিন মাসে কমেছে ১৯১টি।
বিও হিসাব শেয়ার ও ব্যালেন্সশূন্য হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের অপারেটররা বলেন, পটপরিবর্তনের পরও দেশের পুঁজিবাজারের কোনো উন্নতি হয়নি। এখনো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পারেনি সরকার ও বিএসইসি। ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনও আসেনি। গত এক দুই বছরে কোনো আইপিও বা প্রাথমিক শেয়ার আবেদন আসেনি বাজারে।
আর গত ৭ জানুয়ারি নিকুঞ্জে ডিএসই ভবনে পুঁজিবাজারের অংশীদারদের সাথে বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, সংস্কারের কারণে পুঁজিবাজার সাময়িকভাবে খারাপ অবস্থায় আছে। সংস্কারকাজ শেষে পুঁজিবাজার ভালো অবস্থানে চলে যাবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর জন্য যথেষ্ট সহায়তা করছে সরকার। নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে, আইসিবিকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে, এসব তো আস্থা ফেরাতেই করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভালো সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা হবে। প্রাকৃতিকভাবে ভালো শেয়ারের মাধ্যমে পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদে ভালো হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) অর্থ উপদেষ্টাকে সম্প্রতি এক চিঠিতে বলেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পরিচালনাকারী সংস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং আর্থিক নিরীক্ষক, রেটিং এজেন্সিসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ঘাটতির কারণে আস্থার মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে সমস্যা রয়েই গেছে। আস্থার সঙ্কট প্রকট। কংক্রিট কিছু দেখতে পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো দরকার এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ দেখছি না। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে সরকারকে অবহিত করা হচ্ছে। আমরা সব সময়ই বলে আসছি। তবে বলতে গেলেই শুনতে হচ্ছে সংস্কার কমিটি কাজ করছে।






