ফুটবল মাঠে ঈর্ষণীয় পারফরম্যান্স ও বিনীত আচরণ মোহাম্মদ সালাহকে মুসলমানদের গর্বে পরিণত করেছে। এদিকে সালাহ’র ইমেজকে কাজে লাগিয়ে নিজের যত কুকর্ম ও অপরাধ আছে তাতে স্বচ্ছতার প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করছেন চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ। তিনি শুরু করেছেন সালাহকে নিয়ে রাজনীতি।
প্রথমে এই চেচনিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মিসর দলের অনুশীলনে গিয়ে সালাহকে সাথে নিয়ে আখমদ স্টেডিয়াম পরিদর্শন করেন। এরপর সালাহ’র হাত তুলে ধরে তার সাথে ছবি তুলেছেন। এখন এই ফুটবল স্টারকে দিয়েছেন চেচনিয়ার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব। গত শুক্রবারের ঘটনা এটি।

চলমান বিশ্বকাপে মিসর দলের বেস ক্যাম্প ছিল রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য চেচনিয়ার রজাধানী গ্রোজনিতে। আর এই সুযোগেই সালাহ’র ইমেজকে কাজে লাগিয়ে চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ বর্হিবিশ্বে নিজের অবস্থান উন্নত করার চেষ্ট করছেন। রমজান কাদিরভের বিপক্ষে তার দেশে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার মতাদর্শ বিরোদীদের কঠোর হস্তে দমন করা, গুম করে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বহুবিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড তার নির্দেশে হয়েছে বলে ব্যাপক অভিযোগ।
তাই এই লৌহ মানব বর্হিবিশ্বে ব্যাপক সমালোচিত এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য।

এদিকে চেচনিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে ছবি তুলে মোহাম্মদ সালাহও অনেকের অপ্রিয় হয়ে গেছেন। অনেকেই সালাহর সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছে কাদিরভের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য। আসলে সালাহ’র কী দোষ? একজন প্রেসিডেন্ট যদি তার সাথে দেখা করেন ও ছবি তুলতে চান তা হলে এড়িয়ে যাওয়ার তো উপায় থাকে না। তাছাড়া এই চেচনিয়ায় তো মিসর দল আতিথ্য গ্রহণ করেছে। গত শুক্রবার মিসর দলকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট। তখনই সালাহকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণ দেন রমজান কাদিরভ। সাথে চেচনিয়ার ক্লাব এফসি আখমদ গ্রোজনি দলের জার্সী উপহার দেয়া হয় সালাহকে। রমজানের বাবার নামেই এই ক্লাব।

এবারের বিশ্বকাপে মেসি, রোনালদো, নেইমারের চেয়ে কম আলোচনায় ছিলেন না সালাহ। বিশেষ করে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের স্প্যানিশ ফুটবলার সার্জিও রামোস কর্তৃক ফাউলের শিকার হয়ে মারাত্মক আহত হওয়া ও পরবর্তীতে সালাহ’র বিশ্বকাপে খেলার অনিশ্চয়তা আরো ব্যাপক মাত্রায় আলোচনায় নিয়ে আসে তাকে। এই লিভারপুল তারকা শেষ পর্যন্ত সকল শঙ্কা কাটিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলেছেন মোহাম্মদ সালাহ। উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে সাইডলাইনে বসে থাকলেও রাশিয়ার বিপক্ষে পুরোপুরি ফিট না হওয়া সত্ত্বেও খেলেছেন। গোলও করেছেন পেনাল্টি থেকে। এই একটি বিষয়ে তিনি লিওনেল মেসির চেয়ে এগিয়ে। এবারের বিশ্বকাপে মেসি এখনও গোলশূন্য। মিস করেছেন পেনাল্টি। অন্যদিকে সালাহ’র ভাণ্ডারে এক গোল। সোমবার সালাহর মিসরের শেষ ম্যাচ সৌদি আরবেব বিপক্ষে। ভলগোগ্রাদে অনুষ্ঠিতব্য এই্ ম্যাচটি দুই দলেরই নিয়ম রক্ষার। তবে সালাহ’র শেষ সুযোগ গোল করে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং দলকে জেতানো।

রাশিয়ার বিপক্ষে দুই দফা স্বাধীনতা যুদ্ধ করে চেচনিয়া। ১৯৯৩ সালে চেচনিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষনা করে রাশিয়া থেকে। এর ক্ষুদ্ধ রুশ বাহিনী চেচনিয়া আক্রমণ করলে ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। তাতে জয় হয় চেচেন মুসলিমদের । এরপর রুশবাহিনী ফের চেচনিয়া আক্রমণ করে ১৯৯৯ সালে। তখন এই রমজান কাদিরভের বাবা আখমদ কাদিরভ তার বাহিনী নিয়ে দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থা নিয়ে হাত মেলায় রুশদের সাথে। ফলে ২০০০ সালে পরাজয় হয় চেচনিয়ার যোদ্ধাদের। আখমাদ কাদিরভ হন চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট। পরে স্বাধীনতাকামীদের স্টেডিয়ামে পেতে রাখা বোমায় নিহত হন আখমাদ। এরপর দেশের প্রেসিডেন্ট হন ছেলে রমজান। তখনই তিনি বিরোধীদের দমনে লঙ্ঘন করতে থাকেন মানবাধিকার। তাই সারা বিশ্বেই রয়েছে তার সমালোচনা। উল্লেখ্য ১৯১৭ সালে চেচনিয়া দখল করে সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তখন চেচেনদের শুরু করা স্বাধীনতা যুদ্ধ হারের মাধ্যমে শেষ হয় ১৯২১ সালে।

আরো পড়ুন : যেভাবে থামানো হলো মেসিদের বিদ্রোহ
ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ‘ভয়াবহ’ পরাজয়ের পর কোচ সাম্পাওলির বিরুদ্ধে একযোগে বিদ্রোহ করেছিলেন আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা। যদিও তারা তাতে সফল হননি। আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির কাছে মেসিদের দাবি ছিলো কোচকে অপসারণের। কিন্তু তাতে সায় দেননি সভাপতি ক্লাউদিয়ো তাপিয়া।

ক্রোয়েশিয়ার কাছে পরাজয়ের পর কোচের অপসারণ চেয়েছিলো মেসি-ম্যাচেরানোরা। ম্যাচের পরই লিওনেল মেসি, হাভিয়ের ম্যাচেরানোসহ সিনিয়র খেলোয়াড়রা জানিয়েছিলে, এই কোচের ওপর তাদের আর আস্থা নেই। তারা নতুন কোচ চান। যদিও তাতে সায় দেয়নি আর্জেন্টানই ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ক্লাউদিয়ো তাপিয়া।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্টরা অবশ্য নাইজেরিয়া-আইসল্যান্ড ম্যাচের পর কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। নাইজেরিয়ার কাছে আইসল্যান্ড পরাজিত হওয়ার পর মেসিদের সামনে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার। সে জন্য আগামী মঙ্গলবার শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়াকে হারাতে হবে তাদের।
ক্রোয়েশিয়ার সাথে পরাজয়ের পরদিন শুক্রবার টিম হোটেলে কোচ সাম্পাওলি, এএফএ প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া তাপিয়া ও অন্যান্য কোচিং স্টাফদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন দলের ২৩ খেলোয়াড়। হাভিয়ের ম্যাচেরানোর নেতৃত্বে খেলোয়াড়রা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের দাবি জানায় বোর্ড প্রেসিডেন্টের কাছে। সেই দাবি ছিলো- নাইজেরিয়া ম্যাচের আগে কোচ সাম্পালিকে সরিয়ে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া। তারা চেয়েছিলো ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে জয়সূচক গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেয়া জর্জে বুরুচাগাকে কোচ হিসেবে। বর্তমানে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বুরুচাগা।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ী দলের আরেক সদস্য ও বুরুচাগার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিকার্ডো গুইস্তি জানিয়েছেন, খেলোয়াড়রা এই দাবিতে অটল ছিলো। তারা কোন ছাড় দিতে চায়নি। তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা দলটিকে আবার গড়ে তুলতে চেয়েছে। তারা সাম্পাওলি ও তাপিয়াকে বলেছে, খেলোয়াড়রাই এখন দলের ভালো-মন্দ দেখভাল করবে। তারা নিজেদের হাতে তুলে নেবে দলের দায়িত্ব। সাম্পাওলি চাইলে দলের ডাগআউটে থাকতে পারেন; কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। তার করার মত কোন কাজ থাকবে না।’

ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে পরাজয়ের জন্য খেলোয়াড়রা কোচ সাম্পাওলির কৌশল পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। আগের ম্যাচের চার ডিফেন্ডারের ফরমেশন পাল্টে এদিন তিন ডিফেন্ডার খেলান সাম্পাওলি। খেলোয়াড়রা মনে করছেন, কোচের কোন কৌশলগত পরিকল্পনাই ছিলো না শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে। খেলোয়াড়দের দাবির পরও কোচ সাম্পাওলির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে রাজি হননি আর্জেন্টাইন ফুটবল প্রধান তাপিয়া। যদিও সাম্পাওলি অনেকের কাছে জানিয়েছে, বিশ্বকাপের মাঝপথে না হলেও টুর্নামেন্ট শেষে তাকে বরখাস্ত করা হবে এমনটা তিনি নিশ্চিত।

আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন চায় সাম্পাওলি নিজ থেকেই চলে যাক এবং কোন বকেয়া বেতন ভাতার দাবি না করুক। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে কি বেতন ভাতার জন্যেই খেলোয়াড়দের দাবির মুখেও সাম্পাওলিকে সড়াতে চাননি ফেডারেশন সভাপতি?

এই রকম অচলাবস্থা চলতে থাকলে মঙ্গলবার মেসিরা কতটা প্রস্তুতি নিয়ে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আর মাঠের বাইরের গোলযোগের প্রভাব মাঠের খেলায় পড়াটাই স্বাভাবিক। তেমনটি হয়ে হয়তো প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হতে পারে দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের।
এদিকে ম্যাচের পর ড্রেসিং রুমে ম্যাচেরানোর সাথে ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ান পাভোনের হাতাহাতি হয়েছে বলে কথিত আছে। ভুলের জন্য গোলরক্ষক কাবায়েরোকে দুষতে থাকেন ম্যাচেরানো। এর প্রতিবাদ করেন পাভোন, জবাবে পাভোনকে ‘শিশু’ বলে আখ্যায়িত করেন ম্যাচেরানো। এরপরই দুজনের মধ্যে হাতাহাতি হয় বলে জানা গেছে। তবে পরদিন সকালে টুইটারে এই দুই খেলোয়াড়ের একটি হাস্যজ্জ্বল ভিডিও আপলোড করে সব কিছুই স্বাভাবিক বলে দাবি করা হয়েছে। সূত্র : দ্য সান, লন্ডন