বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম রাউন্ড শেষে শনিবার শুরু হচ্ছে দ্বিতীয় রাউন্ড। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে পরবর্তি সবগুলো পর্ব হবে নক আউট পদ্ধতিতে। তাই নির্ধারিত সময়ে কোন খেলা অমীমাংসীত থাকলে, দেয়া হয় অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময়। তাতেও জয়-পরাজয় নির্ধারিত না হলে প্রয়োগ হয় পেনাল্টি শুট আউটের মাধ্যমে টাইব্রেকিং পদ্ধতি। টাইব্রেকার এমন এক নাম যেখানে এলে নিরব হয়ে যায় উত্তেজনাময় ফুটবলের সব উদ্দামতা, থমকে যায় স্টেডিয়ামসহ পুরো ফুটবল দুনিয়া। গোল লাইন আর ১২গজ দুরত্বের একটি বিন্দুর মধ্যে পেন্ডুলামের মত দুলতে থাকে ম্যাচের ভাগ্য।
আশা নিরাশার দোলাচালে দুলতে থাকে পক্ষ বিপক্ষের সবাই। মূহুর্তের সফলতা-বিফলতা কাউকে হাসায় আবার কাউকে কাঁদায়। কেউ হিরো হয় কেউ বা ভিলেন। কিক নিতে যাওয়া খেলোয়ারটি কিংবা প্রতিপক্ষ দলের গোল রক্ষক দুজনকেই দিতে হয় চরম পরীক্ষা। দুজনের যে কারও পরবর্তি কয়েক সেকেন্ডের উপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে ইতিহাস, পাল্টে যেতে পারে ফুটবলের দুঃখ সুখের কাব্য। টাইব্রেকারকে অনেকে 'কিক অব ডেথ' বলেও সম্মোধন করে থাকেন। তাই তো ফুটবল বিশ্বকাপের সাথে টাইব্রেকার জড়িয়ে আছে অনেক আনন্দবেদনার স্মৃতি হয়ে।
যেভাবে এলো টাইব্রেকার
গুরুতর ফাউল ঠেকাতেই ফুটবলে পেনাল্টি কিক চালু করা হয়। ১৮৯১ সালের সেপ্টেম্বরে এক ম্যাচে ওলভহার্মটন ওয়ান্ডারার্সের জন হিথ ফুটবল ইতিহাসে প্রথম পেনাল্টি নিয়েছিলেন একরিংটন স্ট্যানলির বিপক্ষে। পরবর্তিতে এই পেনাল্টি কিককেই টাইব্রেকার হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। কোনো আন্তর্জাতিক আসরের ম্যাচে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে নিষ্পত্তি হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। সেবারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়া ৫-৩ ব্যবধানে হারায় পশ্চিম জার্মানিকে। ঐতিহাসিক প্রথম শটটা ঠিকমতোই জালে পাঠিয়েছিলেন চেকোস্লোভাকিয়ার মারিয়ান ম্যাসনি
বিশ্বকাপে টাইব্রেকার
১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে প্রথম প্রচলন হয় টাইব্রেকারের। অবশ্য সেবার মূলপর্বে কোন ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়নি। তবে আফ্রিকান অঞ্চলের বাছাই পর্বে (১৯৭৭ সালের ৯ জানুয়ারি) তিউনিসিয়া টাইব্রেকারে হারিয়েছিল মরক্কোকে। পরের বার অর্থাৎ ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম টাইব্রেকারে মিমাংসা হয়।
নির্ধারিত সময়ে খেলায় ৩-৩ গোলে সমতা ছিল। টাইব্রেকারে পশ্চিম জার্মানি ৫-৪ ব্যবধানে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে। ফ্রান্সের পক্ষে স্তাইলাইক তৃতীয় শট ও ম্যাক্সিম বসিস ষষ্ঠ শটটা মিস করেন। জার্মানীর পক্ষে চতুর্থ শট মিস করেন দিদিয়ের সিক্স যার ফলে ব্যবধান দাড়ায় ৫-৪। জার্মানির গোলরক হারাল্ড টনি শুমাখার সেবার নায়ক বনে যান।
এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৯টি আসরের মোট ২৬টি ম্যাচ গড়িয়েছে টাইব্রেকারে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তিন-তিনটি কোয়ার্টার ফাইনালের নিষ্পত্তি হয়েছিল টাইব্রেকারে। সেবারও ফ্রান্সকে নামতে হয়েছিল এই পরীক্ষায়। তবে তাতে তাড়া উৎরে যায় ভালো ভাবেই। ভাগ্য সঙ্গ দেয় ফ্রান্সকে। ব্রাজিলকে তারা টাইব্রেকারে হারায় ৩-৪ ব্যবধানে। ১৯৯০ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই শুরু হয় টাইব্রেকার পরীক্ষা। সেবার আয়ারল্যান্ড-রোমানিয়ার ম্যাচ গোলশূন্য ড্রর পর টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালের ছাড়পত্র পায় আইরিশরা।
একই বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের জমজমাট ম্যাচে ইংল্যান্ডের কপাল পোড়ে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে। স্টুয়ার্ট পিয়ার্স ও ক্রিস ওয়াডেল দুজনেই কিক মিস করায় ইংল্যান্ডের আশা ভঙ্গ হয়। অন্য সেমিফাইনালেও ইতালিকে টাইব্রেকারে পরাজিত করে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সব আসরেরই ২য় রাউন্ডের একটি করে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল টাইব্রেকারে। এর মধ্যে ১৯৯৮-এ আর্জেন্টিনার কাছে ইংল্যান্ডের পরাজয় বিশ্বকাপ দর্শকদের অনেক দিন মনে থাকবে।
২০১৪ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল-চিলি, কোস্টরিকা-গ্রিস, কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ড-কোস্টারিকা ও সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ড ম্যাচ নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ টাইব্রেকারে মীমাংসা হওয়ার ঘটনা এপর্যন্ত দুটি। ঘটনাক্রমে দুবারই ইতালি ছিল এই ঘটনার স্বাক্ষী। ১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে রবার্তো ব্যাজিও'র কিক মিস হলে চতুর্থবার শিরোপার স্বাদ পায় ডুঙ্গার ব্রাজিল(৩-২)। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আবারও টাইব্রেকার পরীক্ষায় নামতে হয় ইতালিকে। এবার অবশ্য ফ্রান্সকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে আজ্জুরিরা।
আরো কিছু তথ্য
এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসে ২৬টি ম্যাচ গড়িয়েছে টাইব্রেকারে। কিক হয়েছে ২০০টির কিছু বেশি। এর মধ্যে মিস হয়েছে শতকরা ৩০ ভাগ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম টাইব্রেকারে গোল করতে ব্যর্থ হন জার্মানির উলি স্টিলাইক। ১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপের ঘটনা সেটি। তবে এরপর আর জার্মানির কেউ টাইব্রেকারে গোল মিস করেনি। ইংলিশরা বিশ্বকাপে মোট ১৪টি টাইব্রেকার কিক নিযেছে, যার মধ্যে ৭টিতেই ব্যর্থ তারা।
মেয়েদের বিশ্বকাপেও দুটি ফাইনালে শিরোপার নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকারে। ভিন্ন ভিন্ন ভুমিকায় দুইবারই এই ঘটনার স্বাক্ষী যুক্তরাষ্ট্র। এই জায়গায় তারা পুরুষদের বিশ্বকাপে ইতালির মত একই অবস্থানে। ১৯৯৯ মেয়েদের বিশ্বকাপ ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র ৫-৪ ব্যবধানে হারায় চীনকে। তবে এশিয়ারই আরেক দল জাপানের বিপক্ষে গত বিশ্বকাপের ফাইনালে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হেরে যায় ১-৩-এ।
আরো পড়ুন :
ফ্রান্সের বিপক্ষে জিতবে আর্জেন্টিনা : সোরিন
মস্কোর স্পার্টাক স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে দেয়ালে হেলান দিয়ে টিভিতে জার্মানি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচ দেখছিলেন আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার হুয়ান পাবলো সরিন। একটু পরেই তিনি স্টেডিয়ামে ঢুকবেন ব্রাজিল-সার্বিয়া ম্যাচ দেখার জন্য। ২৭ জুনের এই ম্যাচে জার্মানির পরাজয় ও বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ে উপস্থিত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের সাংবাদিকরা বেশ খুশি ছিলেন।
এই খুশির নেপথ্য একেক জনের কাছে একেক রকম। কারো রাজনৈতিক, কারো ফুটবলীয় শত্রুতা। ব্রাজিলিয়ানরাতো গত বিশ্বকাপে জার্মানদের কাছে ১-৭ গোলে হারের কষ্ট ভুলার চেষ্টা করছিল। আর্জেন্টিনাকে দুই ফাইনালে হতাশ এবং দুই কোর্য়াটার ফাইনালে বিদায় করেছিল জার্মানরা। সর্বশেষটি গত আসরে। কিন্তু সবাই জার্মানদের বিদায়ে উৎফুল্ল হলেও, এদের আচরণে বিস্মিত হলেন সরিন। তার মুখ আর হাত নাড়াই বিস্ময়ের ভাব প্রকাশ করছিল। এর ফাঁকেই তিনি জানান, আর্জেন্টিনার বর্তমান দল নিয়ে তিনি খুব আশাবাদী। ফ্রান্সের বিপক্ষে আজ তার দেশ জিতবে এটা দৃঢ়তার সাথেই উল্লেখ করলেন বর্তমানে ইএসপিএন এ কাজ করা এই সাবেক ফুটবলার।
বললেন, আমার প্রত্যাশা আর্জেন্টিনা এবারও ফাইনালে খেলবে। বিশেষ করে লিওনেল মেসি নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গোল পাওয়ায় উল্লসিত তিনি। তার মতে, মেসি এবার আরো এগিয়ে যাবে। বেশ ভালো করবে চলমান বিশ্বকাপে। ২০০২ এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে খেলা আর্জেন্টিনার সাবেক এই ডিফেন্ডারের মতে, আর্জেন্টিনা দলে ডিফেন্সে কোনো সমস্যা নেই।
গোলরক্ষক সমস্যায় ভুগছে আর্জেন্টিনা। সার্জিও রোমেরোর ইনজুরির কারণে বাদ পড়া এবং এরপর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে উইলফ্রেডো ক্যাভালেরোর মারাত্মক ভুল দলকে পরাজিত হতে বাধ্য করে। ফলে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে পোষ্টের নিচে দাঁড়ান জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ফ্রাঙ্কো আরমানি।
সরিন অবশ্য প্রশংসা করলেন আরমানির। দুইবার উল্লেখ করলেন, ‘আরমানি ভেরি গুড।’ এরপর আর কথা বললেন না গলা ব্যাথার কথা বলে। জানান , ‘নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর অনেক কথা বলতে হয়েছিল আমাকে। তাই গলাটা ব্যাথা। দুঃখিত আর কথা বলতে পারছি না।’ এর পর হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বিদায় নিলেন হুয়ান পাবলো সরিন।



