•  মুখ থুবড়ে পড়েছে ক্লাস রুমের শিখন কার্যক্রম      
  •  সঙ্কট কাটাতে উদ্যোগের আশ্বাস শিক্ষামন্ত্রীর

দেশব্যাপী শিক্ষক সঙ্কটে নাজুক অবস্থায় পড়েছে পাঠদান কার্যক্রম। সম্প্রতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়  প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সব সেক্টরেই শিক্ষকসঙ্কট যেন স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়- সব স্তরেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষক পদ খালি। কোথাও অনুমোদিত পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষক নেই, কোথাও আবার প্রধান শিক্ষক ছাড়াই বছরের পর বছর চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ফলে একই শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে, প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে তাকেই। এতে এক দিকে বাড়ছে শিক্ষকদের ওপর চাপ, অন্য দিকে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান ও শিক্ষার মান।
প্রাথমিকে ৫৬ হাজারের বেশি পদ শূন্য
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর-সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি। এর বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৬ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৫৬ হাজার ৩৯৫টি শিক্ষক পদ, যা অনুমোদিত পদের প্রায় ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট প্রধান শিক্ষক পদে। ৬৫ হাজার ৫০২টি অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদই শূন্য। জেলাভিত্তিক চিত্রেও সঙ্কটের ব্যাপকতা স্পষ্ট। খুলনার ১ হাজার ১৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। রাজশাহীর ১ হাজার ৫৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৮৯টি, রংপুরের ১ হাজার ৪৫৫টির মধ্যে ৬৬৯টি, ফরিদপুরের ৮৮৮টির মধ্যে ৫১৫টি, রাজবাড়ীর ৪৮১টির মধ্যে ২৭৯টি এবং নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭টির মধ্যে ৩৪৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। পাবনায় পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। জেলার ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬১৬টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৫৪ শতাংশ বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই।
মাধ্যমিকে সঙ্কট আরো গভীর
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষকসঙ্কট প্রকট। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৫৭২টি। এর মধ্যে ৩৭৯টি বা ৬৬ শতাংশ পদ শূন্য। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭০৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৭৫ জন; শূন্য ৫২৮টি পদ, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ। বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষকের ১৬ হাজার ১৪১টি পদের মধ্যে শূন্য ৬ হাজার ৪৮টি, প্রায় ৩৭ শতাংশ। এর বাইরে এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে আরো বড় সঙ্কট রয়েছে। সম্প্রতি জাতীয়  সংসদে দেয়া তথ্যে শিক্ষামন্ত্রী জানান, এসব প্রতিষ্ঠানে ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য। আর এপ্রিলের আরেক সংসদীয় তথ্যে সরকারি-বেসরকারি সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি ধারার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোট ৯২ হাজার ৮১টি শিক্ষক পদ শূন্য থাকার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ৭৭ হাজার ২২৭টি এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য।
কারিগরি শিক্ষায় অর্ধেকের বেশি পদ খালি
শিল্প ও কর্মমুখী শিক্ষার চাহিদা যখন বাড়ছে, তখন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই শিক্ষকসঙ্কট সবচেয়ে বেশি। অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৬টি পদ শূন্য- অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি। এ সঙ্কটের ফলে ব্যবহারিক ক্লাস, ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষকসঙ্কট শুধু শ্রেণিকক্ষের সমস্যা নয়; এটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বস্তি নেই
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সংসদে দেয়া আগের সরকারি তথ্যে ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ হাজার ১৫০টি শিক্ষক পদ শূন্য থাকার তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন বিভাগ ও প্রোগ্রাম চালু হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে একই গতিতে হচ্ছে না। ফলে কিছু বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বেড়ে যাচ্ছে, গবেষণা ও তত্ত্বাবধানের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং উচ্চশিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতেই স্পষ্ট সঙ্কট 
প্রাথমিক শিক্ষার সরকারি পরিসংখ্যানে ২০২৩ সালে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১:২৯; বাস্তব অর্জন ছিল প্রায় ১:৩০। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লক্ষ্য ছিল ১:৩০, বাস্তবে প্রায় ১:২৯। অর্থাৎ জাতীয় গড় খুব বেশি খারাপ না দেখালেও জেলা ও বিদ্যালয়ভিত্তিক বৈষম্য এখানে আড়ালে থেকে যায়। কারণ কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও অন্য বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণী বা বিষয়ের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত, চর, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ে এ বৈষম্য আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উত্তরণের উপায় খুঁজছে সরকার
শিক্ষক সঙ্কটের অন্যতম কারণ শুধু নতুন নিয়োগে ধীরগতি নয়; পদ সৃষ্টি, পদোন্নতি, অবসর, বদলি ও শিক্ষক বণ্টনের মধ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। প্রধান শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন খালি থাকায় সহকারী শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। ফলে যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, তিনি অফিসের কাজেও সময় দিচ্ছেন। সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিকের ৩৬ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের যাচাই-বাছাই ও পদায়নের কাজও চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিয়োগ দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কোন জেলায় কত শিক্ষার্থী, কত শিক্ষক প্রয়োজন, কোন বিষয়ে শিক্ষক ঘাটতি বেশি এবং কোন বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক- এসব বিবেচনায় নিয়ে জেলা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষক বণ্টন পরিকল্পনা করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে শিক্ষকই যদি পর্যাপ্ত না থাকেন, তাহলে নতুন কারিকুলাম, ডিজিটাল শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কিংবা মানসম্মত উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন। তাই শিক্ষকসঙ্কটকে আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন দেশের শিক্ষার মান, সমতা ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির সাথে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় সঙ্কট।
সরকারের প্রতিশ্রুতি : সম্প্রতি বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। তাই শিক্ষকতা পেশায় তরুণ ও মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নানামুখী কর্মতৎপরতা নেয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।