স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে নিজেদের পদমর্যাদা ও কর্মপরিধির বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট ধারণা চান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানেরা। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল জেলা পরিষদ। একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের পাঁচ নারী সদস্য নিয়ে গঠিত জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, তাদের কাজ কী হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই। কোন কোন কাজ তদারকি করতে পারবেন বা করা উচিত তাও সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই। এ অবস্থায় বিষয়টি সুরাহা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলামের সাথে আজ রোববার বৈঠকে বসছেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানেরা। কাকরাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের মিলনায়তনে সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানেরা প্রাথমিকভাবে ১০ দফা দাবি তুলে ধরবেন। এ বৈঠকে পদমর্যাদা-কর্মপরিধির বিষয়ে কোনো সুরাহা না হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তারা দেখা করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের অভিযোগ, তাদের পদমর্যাদা ও কর্মপরিধির বিষয়টি আইনে স্পষ্ট না থাকায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও তারা স্থানীয় উন্নয়নে খুব একটা ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে পিরোজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ গতকাল নয়াদিগন্তকে বলেন, কাজ কী হবে না হবে, তা না জেনেই নির্বাচনে নেমেছিলাম। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে তরান্বিত করতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। আমাদের পদমর্যাদাও ঠিক করে দেয়া উচিত। বিষয়টি সুরাহার জন্য আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসব; প্রয়োজনে আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীরও দ্বারস্থ হবো।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাজের পরিধি নির্ধারণ করে না দিলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাজ কী হবে, তারা কী ভূমিকা পালন করবেন তা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি আছে। আইনে কোনোটাই পরিষ্কার করা হয়নি। আইনে তাদের ১২টি ফাংশন আছে। একটা ফাংশন হচ্ছেÑ জেলা পর্যায়ে সব উন্নয়ন কর্মসূচি পর্যালোচনা। এটা যদি করতে হয়, ডিসির নেতৃত্বে যে উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি আছে, সেই ফাংশনটা চেয়ারম্যানের কাছে চলে আসে। তাহলে এটা আদৌ কি হচ্ছে? সেটা দেখতে হবে।
প্রসঙ্গত, ১৭৭২ সালে জেলা প্রশাসন সৃষ্টির ১১০ বছর পর ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের ঐতিহাসিক রেজুল্যুশনের মাধ্যমে তিন স্তরের গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তনে স্থানীয় ‘জেলা বোর্ড’ শক্তিশালী প্রশাসনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়, যা পাকিস্তানের প্রথম দশক পর্যন্ত বজায় ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেলা পরিষদের অবকাঠামো, জনবল, সম্পদ ও জাতীয় বাজেটে নিয়মিত বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি আড়ালে চলে যায়। ১৯৭৫ সালে জেলায় ‘গভর্নর’ নিয়োগ করে জেলা প্রশাসকসহ জেলার সামগ্রিক প্রশাসনকে তার অধীন করে একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুরুতেই তা হোঁচট খায়। পরে বিএনপির শাসনামলে ‘জেলা উন্নয়ন সমন্বয়ক’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করে প্রতিটি জেলায় রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে ওই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রণীত স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়, যা ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ ছিল। পরে বিএনপি সরকার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) এই দায়িত্বে রাখে। ২০০০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত জেলা পরিষদ গঠনের জন্য নতুন আইন করে। ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকার ৬১ জেলায় আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও আদালতের আদেশে কুষ্টিয়া ও বগুড়ায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন আটকে যায়। বিএনপির বর্জনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত ২১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটের দিন আওয়ামী লীগ ও তাদের বিদ্রোহীরা জেতেন ৩৮ জেলায়। এটিই ছিল জেলা পরিষদের ১৩১ বছরের ইতিহাসে প্রথম সরাসরি নির্বাচন।
নির্বাচনের পর ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানরা শপথ নেন। ওই অনুষ্ঠানে মানুষের সেবা ও উন্নয়নে জেলা পরিষদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সরকারের উন্নয়নকাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে নবনির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। চেয়ারম্যানদের উদ্দেশে তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আপনাদের দায়িত্ব হবে প্রতিটি উন্নয়নকাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা, নিজ নিজ জেলার সার্বিক উন্নয়ন ও সমস্যা খুঁজে বের করা। কী করলে সেই জেলার আরো উন্নতি হতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া। কিন্তু এটি করতে গেলে চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা অর্থাৎ পদমর্যাদা ও কর্মপরিধি কী হবে তা আজো পরিষ্কার করা হয়নি। ফলে জেলা পরিষদ সেই তিমিরেই রয়ে গেছে বলে চেয়ারম্যানদের অভিযোগ রয়েছে।
পদমর্যাদা-কর্মপরিধির সুস্পষ্ট ধারণা চান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানেরা
স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সাথে চেয়ারম্যানদের বৈঠক আজ
স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে নিজেদের পদমর্যাদা ও কর্মপরিধির বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট ধারণা চান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানেরা। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে নির্বাচিত...





