বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দর্শক সংখ্যা দিন দিন কমছে। ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, ইউটিউব ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ততা, জীবিকা নির্বাহের তাগিদ, বিজ্ঞাপনের বাড়াবাড়ি ও মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান না হওয়ায় টিভি বিমুখ হয়ে পড়ছেন দর্শকেরা। এর মধ্যেও দেশী দর্শকদের অনেকেই আবার বিদেশী চ্যানেলমুখী হয়ে পড়েছেন। আগে এই প্রবণতা কেবল শহরাঞ্চলের দর্শকদের মধ্যে পরিলক্ষিত হলেও এখন তা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দর্শকদের দেশী চ্যানেলে ফেরাতে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ, বিজ্ঞাপনের মাত্রা নির্ধারণ এবং বিদেশী চ্যানেলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৪৪টি অনুমোদিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। এরই মধ্যে তরঙ্গ বরাদ্দ ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র পেয়েছে আরো তিনটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল। চ্যানেলগুলো হচ্ছে : গ্লোবাল টিভি, তিতাস টেলিভিশন ও সিটিজেন টিভি। বেসরকারি এ তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল শিগগিরই সম্প্রচারে আসছে বলে জানা গেছে। গ্লোবাল টিভির কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছে গ্লোব মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড, তিতাস টেলিভিশনের মালিকানায় মিলেনিয়াম মিডিয়া লিমিটেড, আর সিটিজেন টিভির মালিকানায় রয়েছে সিটিজেন টেলিভিশন লিমিটেডে। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হকের আমার টিভি এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের খেলা টিভির কথাও শোনা গেছে। এ ছাড়া আরো কয়েকটি চ্যানেল অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটিএন বাংলার পরিচালক নওয়াজেশ আলী খান সম্প্রতি গ্লোবাল টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নব্বই দশকের গোড়ার দিকে এ দেশে প্রথম স্যাটেলাইট টিভির প্রচলন শুরুর পর তা মূলত ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরকেন্দ্রিক ছিল। মহানগরীতে পাড়ায় পাড়ায় ডিশ লাইন সংযোগ গ্রহণের মাধ্যমে তখন থেকে বিদেশী টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখার প্রথম সুযোগ সৃষ্টি হয়। শুরুতে যখন মাত্র কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে তখন দর্শক অনেক আশাবাদী হয়ে তা দেখতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রেই দর্শকপ্রিয়তা পায় চ্যানেলগুলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ব্যাপকহারে টিভি চ্যানেলের অনুমোদনের পরও দর্শকেরা চ্যানেলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় আড়াই দশক সময়ে ক্যাবল টিভির বিস্তার গ্রামের মানুষকেও অবাধে দেশী-বিদেশী অগণিত চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন রিমোটের বোতাম টিপে ইচ্ছামতো স্টার জলসা, জি বাংলা, স্টার প্লাস, সনি, কালারস, জি টিভি প্রভৃতি চ্যানেলের বাংলা-হিন্দি সিরিয়াল, সিনেমা, গেম শো, রিয়েলিটি শো, নাচ-গান কৌতুকের অনুষ্ঠান হরদম দেখছেন তারা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নারী, পুরুষ, শিশু সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন বিদেশী চ্যানেলের বাংলা-হিন্দি সিরিয়াল, গেম শো, রিয়েলিটি শোগুলোতে বুঁদ হয়ে আছেন। ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে মানুষ কম্পিউটার ও ল্যাপটপে ব্যস্ত রয়েছেন। অবসর সময়ে ইউটিউব ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মশগুল হয়ে থাকেন অনেকে। এ ছাড়া প্রাত্যহিক জীবন-জীবিকার তাগিদে অবসর না পাওয়া এবং দেশী টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের বাড়াবাড়ি ও মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান না হওয়ায় টিভি বিমুখ হয়ে পড়ছেন দর্শকেরা।
আমাদের বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলগুলো কেন দর্শক হারাচ্ছে, কেন বিদেশী চ্যানেলমুখী হচ্ছে বেশির ভাগ টিভি দর্শক? প্রশ্নগুলো আজ বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে সব জায়গায়। বিভিন্ন আড্ডায়, আলোচনায় এ প্রশ্নগুলো আসছে। এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতে এখন অনেকটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক দেখানো হয়। পরিবারে নারীদের মধ্যে ভারতীয় নাটকের জনপ্রিয়তা বেশি হলেও অনেক পুরুষই নিয়মিত এই নাটকগুলো দেখেন। বাংলাদেশে যে হারে নাটক তৈরি হচ্ছে, সে হারে অভিনেতা বা কলাকুশলী তৈরি হয়নি। আমাদের এখানে প্রবণতা হচ্ছে কম বিনিয়োগে বেশি নাটক তৈরি করা। চ্যানেল বাড়ার ফলে হঠাৎ করেই টেলিভিশন নাটকের যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেটি জোগান দেয়ার মতো অবকাঠামো তৈরি হয়নি। চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যেনতেন জিনিস তৈরি হচ্ছে, যার ফলে নাটকের মানের অবনতি ঘটছে।
তিনি বলেন, বাইরের সিরিয়াল এখানে ডাবিং করে চালানো হচ্ছে। এগুলোর সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি এতে সাংস্কৃতিক কর্মীও তৈরি হয়না। শুধু চ্যানেলগুলো তার মুনাফা অর্জনের উদ্দেশে এই কাজটা করে যাচ্ছে। এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে টেলিভিশন চ্যানেলে। এ অবস্থায় এক শ্রেণীর অনুষ্ঠান দিয়ে সব শ্রেণীর দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা না করে, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্য আলাদা অনুষ্ঠান প্রচার জরুরি।
এ দিকে বাইরের আগ্রাসন এবং বিজ্ঞাপন ও দর্শকের বাজার সীমিত হওয়ার কারণে নতুন চ্যানেলগুলো দুর্বল হবে এবং হুমকি ও চাপের মুখে থাকবে বলে মনে করছেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজ।
অন্য দিকে দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেল ওনারা’স (এটকো)-এর দাবির মুখে সম্প্রতি বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। একই সাথে দর্শকদের বিদেশী চ্যানেলবিমুখ করতে দেশীয় চ্যানেলগুলোর সিরিয়াল ক্যাবল অপারেটরের শুরুর দিকে রাখার নির্দেশনা দেয় মন্ত্রণালয়। তা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছেন ক্যাবল অপারেটররা।