অসংখ্য গর্ত আর খানাখন্দে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়া প্রধান সড়ক সংস্কার প্রকল্প হাতে নিয়ে কাজ শুরু করতে বিলম্ব করায় নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন নবগঠিত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব:) ফোরকান আহমদ। গতকাল সোমবার বিকেলে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে তিনি উপস্থিত হলে বিক্ষুব্ধ সুশীল সমাজের তোপের মুখে পড়েন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, শহরবাসীকে দ্রুত সেবা দেয়ার জন্য সড়ক ও জনপদ বিভাগ থেকে কউক প্রধান সড়কটি সম্প্রসারণ ও সংস্কার প্রকল্পটি হতে নিয়েছিল, কিন্তু এটি তার জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ইতোমধ্যে সড়কটির বেশ কয়েকটি অংশে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংস্কার কাজ করা হয়েছে। তবে সড়কটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য প্রসেসিং চলছে এবং দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। তবে উপস্থিত জনতা আশ্বস্ত হতে চাইছেন না। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রায় ৫ কিলোমিটারের অধিক এই সড়কটির প্রস্থ সম্প্রসারণ ও সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নে কউকের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাদের দাবি সড়কটির কাজ দ্রুত সড়ক ও জনপদ বিভাগের কাছে পুনরায় ন্যস্ত করা হোক। সরেজমিন দেখা যায়, পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কটি শহরের লালদীঘির এলাকা থেকে বাসটার্মিনাল পর্যন্ত পুরো অংশ খানাখন্দে সয়লাব হয়ে গেছে। কয়েকদিন আগের বৃষ্টি এই সড়কের কফিনে শেষ পেরেক মেরেছে। বৃষ্টির পর থেকে পুরো সড়কটি সম্পূর্ণভাবে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে! তবুও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনের এই খানাখন্দ মাড়িয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন ও যাত্রীরা। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন শহরবাসী ও পর্যটকেরা। এই নিয়ে কঠোর সমালোচনা মুখে পড়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। যাত্রীরা চলাফেরায় দুর্ভোগের প্রাক্কালে কউককে প্রকাশ্যে গালমন্দ করে যাচ্ছেন! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন। সাংবাদিক ইমাম খাইর লিখেছেন ‘গজবি শহর পর্যটন শহর, ভাঙাচুরা রাস্তার কারণে যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ, যন্ত্রণা বেড়েছে শতগুণ।’ কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি আবু মোর্শেদ চোধুরী খোকা লিখেছেন ‘কার দায়িত্ব, কখন কাজ ধরবে তা আমরা জানতে চাই না। আমদের এই মুহূর্তে দরকার জনবান্ধন নিরাপদ সড়ক। এ অবস্থা বাংলাদেশের কোনো জেলা শহরে আছে কি না আমার জানা নেই।’ দৈনিক কক্সবাজারের পরিচালনা সম্পাদক মুজিবুল ইসলাম লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আগেই কক্সবাজারের প্রধান সড়ক সচল চাই। অনন্যোপায় জেলাবাসী এ ব্যাপারে খোদ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছে।’ কউক সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পিত নগরায়নের অংশ হিসেবে কক্সবাজার শহরের ‘হলিডের মোড়-বাজারঘাটা হয়ে লারপাড়া বাসস্ট্যান্ড’ পর্যন্ত প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত হবে। শহরের সৌন্দর্যবর্ধন ও যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২৯৪ কোটি ১৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকায় সড়কটি চার লেন করার প্রকল্প নিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। গত বছরের ১৬ জুলাই একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে প্রকল্পটি। গত ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করার কথা বলেছিলেন কউক চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব:) ফোরকান আহমদ। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজ শুরুই হয়নি। সড়কটি দীর্ঘ দিন সড়ক বিভাগের অধীনের ছিল। তারা সড়কটি বহুকাল পূর্ণাঙ্গ সংস্কার না করলেও মাঝে মাঝে জোড়াতালি দিয়ে চলাচলের কোনোরকম উপযোগী রাখতেন। বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়লে কক্সবাজার পৌরসভাও মাঝে মাঝে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু কউকের অধীনে চলে যাওয়ার পর সড়ক বিভাগ ও পৌরসভা এই সড়কের দিকে আর চেয়েও দেখেনি। বরং আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে তারা নিজেদের দায় গুছিয়ে নিয়েছেন। নিজেরদের অধীন থেকে চলে যাওয়ায় তারা বরং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ দিকে নিজেরদের অধীনে নিয়ে নেয়ার পর কউক কয়েকবার বড় বড় খান্দখন্দে ইটের খোয়া ফেলেছে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম বিদায়ের গত চার-পাঁচ মাসেও একটি ইটের খোয়া বা এক মুঠো মাটিও কোথাও দেয়নি কউক। বরং কউক চেয়ারম্যানের দাবি ছিলÑ ইটের খোয়া ফেলে যে ‘সংস্কার’ করা হয়েছিলো সেখানে যে পরিমাণ টাকা গেছে তার সুফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ কারণে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো সংস্কার করছে না তাও তারা বলছে না। এতে শহরের প্রধান সড়কটি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করে যাচ্ছেন শহরবাসীর! খানাখন্দক অন্য দিকে যানজটের দুর্ভোগ- সব মিলে শহরে চলাচল সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়েছে। তাই দুর্ভোগের শিকার শহরবাসী প্রতিনিয়ত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে গালি-গালাজ করে যাচ্ছেন। শহরবাসী বলছেন, শহরের চলাচলের একমাত্র সড়কটি মরে গেছে। কিন্তু কউক পড়ে আছে পুকুর উন্নয়নে। শহরের পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পর্যকেরা কক্সবাজার শহরে ঢুকে একেবারেই হতাশ হচ্ছেন। সড়কের এই করুণদশা তাদের ভ্রমণের আনন্দকে ফিঁকে করে দিচ্ছে। এ দিকে গতকালের সভায় বক্তারা বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে কক্সবাজারের প্রধান সড়কের কাজ শুরু না করলে কক্সবাজারের ছাত্র যুব পেশাজীবীরা প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেবে। এতে বক্তব্য রাখেন, কক্সবাাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুল ইসলাম, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের, তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আয়াচুর রহমান পৌর কাউন্সিলর মাহবুবুর রহমান প্রমুখ। সভার শেষপর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতা রাশেদুল ইসলামের মেয়রকে উদ্দেশ করে দেয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মেয়রের সাথে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।





