‘চোরে শোনে না ধর্মের কাহিনী।’ এ কথা সবার জানা। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে নড়াইলে।

করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্থ কর্মহীন নড়াইল সদরের বরাশুলা এলাকার আঞ্জু বেগমকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঈদ উপহার চুরি হয়ে গেছে। নড়াইল সদর হাসপাতালের সংক্রমক ওয়ার্ড থেকে এই ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে হতদরিদ্র আঞ্জু বেগমের অষ্টম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে ইয়াসমিন আক্তার মুক্তার চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। টাকার অভাবে ঠিকমত ওষুধ
কিনতে পারেনি। হাসপাতাল থেকে তাকে বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্থ আঞ্জু বেগম জানান, গত ১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঈদ উপহার দুই হাজার পাঁচ শ’ টাকা পেয়ে ওই দিনই অসুস্থ ছোট মেয়ে মুক্তাকে নিয়ে নড়াইল সদর হাসপাতালে যান তিনি। মুক্তার প্রচণ্ড পেটে ব্যথাসহ জ্বর, বমি ও ঘন ঘন পায়খানা হওয়ায় তাকে সংক্রমক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অসুস্থ ছোট মেয়ের সাথে তার বড় মেয়েও হাসপাতালে ছিলেন। পরের দিন ১৫ মে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে অসুস্থ বোনকে নিয়ে বড় বোন হাসপাতালের বাথরুমে গেলে ছোট্ট একটি ব্যাগে রাখা প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সেই ঈদ উপহার দুই হাজার পাঁচ শ’ টাকা কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যায়। বাথরুম থেকে এসে টাকাগুলো পায়নি তারা। ওই টাকার সাথে বাড়ির আরো কিছু টাকা মিলিয়ে প্রায় চার হাজার টাকা ছিল ব্যাগটিতে। এরপর হাসপাতাল থেকে চলে আসেন তারা।

এই টাকা চুরির ঘটনায় দিশেহারা আঞ্জু বেগম। প্রায় ছয় মাস আগে থেকে অসুস্থ হয়ে সব কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন তার স্বামী। সেই থেকে সংসারে পাঁচ সদস্যের ভরপোষণ আঞ্জু বেগমের আয়ের ওপরই চলছে। বসতভিটার পাঁচ শতক জমি ছাড়া তাদের আর কিছু নেই। তাও এই জমির সব টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারেননি।

আঞ্জু বেগম পরের বাড়িতে কাজসহ রান্নাবান্না করলেও করোনাভাইরাসের কারণে এসব কাজ এখন বন্ধ রয়েছে। তাই দুশ্চিন্তার শেষ নেই তাদের। এ পরিস্থিতিতে টাকা চুরির ঘটনা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়েছে।

আঞ্জু বেগম জানান, তার ছোট মেয়ে মুক্তা প্রায় দুই মাস ধরে পেটে ব্যাথায় ভুগছে। টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি। গত ১৪ মে বেশি ব্যথা উঠলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ধারণা করছেন, তার মেয়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিস ব্যথা হয়েছে। তবে টাকার অভাবে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করানো সম্ভব হয়নি।

এদিকে সাংবাদিকদের মাধ্যমে অসহায় কর্মহীন আঞ্জু বেগমের টাকা চুরির ঘটনা শুনে তার মেয়ে মুক্তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পিপিএম (বার)। ঘটনাটি জানার পর রোববার বিকেল ৪টার দিকে ক্ষতিগ্রস্থ আঞ্জু বেগমকে ফোন দিয়ে তাৎক্ষণিক খোঁজ-খবর নেন পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন। অসুস্থ মাদরাসা শিক্ষার্থী মুক্তাকে আজ সোমবার হাসপাতালে ভর্তি করানোসহ তার চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করেছেন মানবিক পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।

অন্যদিকে নড়াইলের পুলিশ সুপার অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ায় মহাখুশি আঞ্জু বেগমসহ তার পরিবার। তারা পুলিশ সুপারের জন্য দোয়া করেন।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১৮ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে নড়াইল সদরের হবখালী ইউনিয়নের কোমখালী গ্রাম থেকে অসুস্থ এক রোগীকে পুলিশ অ্যাম্বুলেন্সে সদর হাসপাতালে আনার ব্যবস্থা করেন পুলিশ সুপার। এরপর ৬ মে রাত ৮টার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের উত্তরখলিশাখালী গ্রামের রিপন বিশ্বাসের মোবাইল ফোন পেয়ে পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে প্রসববেদনায় কাতর তার স্ত্রী অনিতাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রায় এক বছর আগে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুচিয়াবাড়ি গ্রামে সন্তান কর্তৃক বাঁশবাগানে ফেলে দেয়া বয়োবৃদ্ধ এক মাকে হাসপাতালে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পিপিএম (বার)। এছাড়া আরো অনেক মানবিক কাজসহ নড়াইলের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ভূঁয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন তিনি।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে খবর পেয়ে অসহায় আঞ্জু বেগমের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি। তার মেয়ের চিকিৎসাসহ হাসপাতাল থেকে টাকা চুরির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।