গাজীপুর মহানগরের প্রাণকেন্দ্র গাছা অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি রাস্তায় চলাচলকারী রিকশা থেকে প্রতিদিন নিয়মিত চাঁদা আদায় করেন স্থানীয় সরকার দলীয় নেতারা। রিকশামালিকের জমা ও নেতাদের চাঁদা দিয়ে অনেক সময় খালি হাতে বাসায় ফিরতে হয় অসহায় রিকশাচালকদের। এমনিতেই বাজারে অসহনীয় দ্রব্যমূল্য, তার ওপর আবার সরকারি দলের চাঁদাবাজদের খড়গ রিকশাচালকদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল স্থানীয় বটতলা রোডের (থানা রোড) বোর্ডবাজার স্ট্যান্ডে ৫০ টাকা চাঁদা না দেয়ায় কথিত ‘জিপি’ আদায়কারী চাঁদাবাজরা আরিফ হোসেন নামের একজন রিকশাচালককে পিটিয়ে আহত করে। ‘আমি রোজা রেখেছি, আমাকে মাইরেন না’ এমন আকুতির পরও কোনো দয়ার উদ্রেক হয়নি চাঁদাবাজদের। এ ঘটনায় ওই দিনই নয়া দিগন্তে সংবাদ প্রকাশের পর জিএমপি কমিশনারের নির্দেশে চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালায় পুলিশ। রিকশায় চাঁদাবাজির ঘটনায় এ পর্যন্ত পৃথক দুটি মামলা দায়ের ও দু’জন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ঘটনার পর আলোচিত বটতলা রোডে চাঁদা আদায় বন্ধ হলেও অন্যান্য রোডে দেদারছে এখনো চলছে চাঁদাবাজি। এমনকি আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে চাঁদাবাজরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রিকশাচালকরা এলাকার সরকারদলীয় প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তারা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রভাবশালীদের নিয়োজিত চাঁদা আদায়কারীদের পুলিশ গ্রেফতার করলেও মূল হোতারা এখনো রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
রিকশাচালকরা জানান, গাজীপুর মহানগরের গাছা অঞ্চলের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বটতলা রোড, সুলতান মেডিক্যাল রোড, কলমেশ্বর কেন্দ্রীয় মসজিদ রোড, আইইউটি রোড, কামারজুরী রোডের সাইনবোর্ড স্ট্যান্ড, ৩৩ ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের সংযোগ সড়ক ভালকারটেক, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের গাছা রোডের বড়বাড়ি স্ট্যান্ড ও বঙ্গবন্ধু কলেজ চৌরাস্তা মোড়, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের ডেগের চালা রোড, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের হারিকেন রোড, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের তারগাছ রোড (চেয়ারম্যান বাড়ি রোড), চান্দরা রোড, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বটতলা রোডের জাঝর বাইপাস মোড়, জাঝর টু হারিকেন, জাঝর টু তিন সড়ক, জাঝর টু ধীরাশ্রম রেলগেটসহ গাছা অঞ্চলে সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ রাস্তায় প্রতিদিন রিকশা থেকে চাঁদা আদায় হচ্ছে।
বোর্ডবাজার কেন্দ্রেীয় মসজিদসংলগ্ন স্ট্যান্ডে ওয়ার্ড কাউন্সিলররের ফুফাতো ভাই যুবলীগ নেতা সিদ্দিক, একই রোডের মধ্য বাজারে হাশু রিকশা থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করছেন। সিদ্দিক স্থানীয় ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করেন বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। সুলতান মেডিক্যাল রোডে চাঁদা আদায় করেন স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি পদপ্রার্থী দেলোয়ার হোসেন, ছাত্রলীগ নেতা মানিক পাঠান, যুবলীগ নেতা সোহেল, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা রকি, আইইউটি রোডে কাউন্সিলরের ভাগিনা ফরহাদ হোসেন, তাঁতীলীগ নেতা জামাল খানের নিয়োজিত নূরু ডেগের চালা ও হারিকেন রোডে এবং আজিজ সাইন বোর্ড রোডে চাঁদা আদায় করেন। বটতলা রোডে যুবলীগ নেতা মিজান ও অন্তর, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল মতিনের নিয়োজিত ডালিম জাঝর কেন্দ্রিক চারটি রোডে রিকশা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন। ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের চান্দরা রোডে আরিফ সরকার, গাছা রোডে মুকুল সরকার ও শিমুল, বঙ্গবন্ধু কলেজ চৌরাস্তায় ভুট্টু ও জয়বাংলা রোডে সারোয়ার সরকার চাঁদা আদায় করেন। রিকশাচালকরা আরো জানান, ইজিবাইক থেকে দৈনিক ৭০ টাকা, মোটাচাকার অটোরিকশা থেকে ২০-৪০ টাকা এবং চিকনচাকার অটোরিকশা থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়।
রিকশাচালক আইয়ুব আলী বলেন, চাঁদাবাজরা আমাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। দিন শেষে গ্যারেজ মালিকের জমা ২৫০ টাকা এবং রোডে চাঁদা ৭০ টাকা দেয়ার পর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। কখনো খালি হাতে বাসায় ফিরতে হয়। স্ত্রী-সন্তানরা যখন হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। সংসার চালানো তো দূরের কথা নিজের পেট চালানোই দায়। তিনি বলেন, আমাদের কষ্টের কথা তুলে ধরুন, রোডে চাঁদা বন্ধ করুন, আমাদেরকে বাঁচান।
সুলতান মেডিক্যাল রোডে চাঁদা আদায়ের কথা স্বীকার করে স্থানীয় যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, চাঁদাবাজি না করলে নেতৃত্ব থাকে না। শুধু আমি একাই না, আরো অনেকেই রিকশা থেকে চাঁদার ভাগ পান। আমি দৈনিক মাত্র ৫০০ টাকার ভাগ পাই। এই টাকা আমি খাই না। গরিবদের বিলিয়ে দিই। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে লিখে কিছু হবে না। কারণ আমাদের দিয়ে চাঁদা আদায় করানো হয়। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে ওপর থেকে বন্ধ করাতে হবে। গাছা থানার অভিভাবককে ধরুন। প্রশাসন চেষ্টা করলে একদিনেই চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারে।