দীর্ঘ দিন ধরেই ট্রেড লাইসেন্স জটিলতায় ভুগছে বরিশালের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। প্রায় দুই বছর বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে কোনো ধরনের ট্রেড লাইসেন্স না দেয়ায় থেমে আছে এই শিল্প এলাকার উন্নয়ন। এ কারণে পদ্মা সেতু চালুর ছয় মাস পরও শিল্পায়নে বিন্দুমাত্র অগ্রগতি নেই বরিশাল বিসিকে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্রেড লাইসেন্স জটিলতার কারণে তারা ব্যবসায়িক কোনো কার্যক্রমেই অগ্রসর হতে পারছেন না। ফলে এক দিকে যেমন বছরের পর বছর তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে, তেমনি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্য দিকে সিটি করপোরেশন বলছে, যারা হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছেন না তারা ট্রেড লাইসেন্স পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে যারা হোল্ডিং ট্যাক্স দিয়েছেন তারা ট্রেড লাইসেন্স পেয়েছেন।
বিসিক এলাকায় বরিশালের প্রথম গার্মেন্ট শিল্প উদ্যোক্তা নিমজার্ক ডিজাইনের স্বত্বাধিকারী তৌহিদুর রহমান জানান, ট্রেড লাইসেন্স না থাকায় তারা উৎপাদনে যেতে পারছেন না। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে লাইসেন্স সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায় আছেন এ ব্যবসায়ী। দ্রুতই ট্রেড লাইসেন্স জটিলতার সমাধান চান তিনি। তৌহিদুর বলেন, একটি ব্যবসার মূলভিত্তি হলো ট্রেড লাইসেন্স। এ লাইসেন্স না পেলে বিএসটিআই সনদ, পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা যায় না।
আরেক প্রতিষ্ঠান বিএমসি টেক্সটাইল মিল লিমিটেডের কর্মকর্তা খাইরুল হাসান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান কমফোর্টার উৎপাদনকারী (ফাইবার দিয়ে তৈরি কম্বলজাতীয় পণ্য)। এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটিও ট্রেড লাইসেন্স জটিলতার কারণে উৎপাদনে যেতে পারছে না। তাদের কাছে ঢাকার ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও তা বরিশালে কোনো কাজে আসছে না। ফলে নানামুখী সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিসিকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জামাল হোসেন জানান, দীর্ঘ দিন গাজীপুরে লন্ড্রি সাবান ও ডিটারজেন্ট পাউডার উৎপাদন কারখানা চালিয়েছেন। পরে ব্যবসা স্থানান্তর করে ২০২০ সালে আসেন নিজ এলাকা বরিশালের বিসিক শিল্প এলাকায়। তিনি অভিযোগ করেন, বরিশালে এসেই ট্রেড লাইসেন্স জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। দুই বছর ঘুরেও ট্রেড লাইসেন্সের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারেননি তিনি।
বরিশাল বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এমন দুর্ভোগে রয়েছেন বিসিকের ৭৬ জন পুরনো ব্যবসায়ী। তারা দুই বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করতে পারছেন না। এ ছাড়া ১৯ জন নতুন উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন করে বসে আছেন। বর্তমানে এখানে চালু থাকা শিল্প ইউনিটগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বহুমুখী সমস্যার কারণে এরই মধ্যে অনেকেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে জটিলতা থাকায় বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) দুই বছর আগে বিসিকের ব্যবসায়ীদের নতুন ট্রেড লাইসেন্স দেয়া ও পুরনোদের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে এর মধ্যে তা আবার চালু করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিসিক শিল্প মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ নাজমুন নাহার রিনা বলেন, ট্রেড লাইসেন্স জটিলতার কারণে আমার প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধের পথে। বন্ধ হলে শুধু আমার একার লোকসান হবে না, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ’ শ’ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। তিনি আরো বলেন, শিল্পনগরের মালিক হচ্ছে বিসিক। হোল্ডিং ট্যাক্সও পরিশোধ করবে তারা।
বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খান জানান, সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স না দেয়ায় তারা বছরের পর বছর লোকসান গুনছেন। তা ছাড়া বিসিক শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সিটি করপোরেশনের সাথে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, এই শিল্প এলাকার জন্য বিসিক কর্তৃপক্ষকে বার্ষিক আড়াই ভাগ হারে সার্ভিস চার্জ দেয়া হচ্ছে। তাই আলাদাভাবে সিটি করপোরেশনকে হোল্ডিং ট্যাক্স দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স শাখার সুপারিনটেনডেন্ট কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সম্প্রতি একটি মিটিংয়ের মাধ্যমে বিসিক কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশন সমাধানে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় যেসব ব্যবসায়ী প্লটের নামে হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছেন, তাদের ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকজন ব্যবসায়ী এ সুবিধা নিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক জালিস মাহমুদ বলেন, শিল্প আইন অনুসারে বিসিক কর্তৃপক্ষ অথবা প্লট মালিক পৃথকভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে পারেন। তবে এ বিষয়ে যে সমস্যা ছিল শিগগির তা সমাধান হবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর পর নতুন নতুন ব্যবসায়ী বিসিকে আবেদন করছেন। তাদের আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষ হয়ে বরাদ্দের জন্য চূড়ান্তপর্যায়ে রয়েছে। ভোলার গ্যাস বরিশাল এলে বিসিক আরো সমৃদ্ধ হবে।





