যশোরের চৌগাছায় পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লোকসানে চাষিরা। চলতি মৌসুমে পাটের আঁশ ভালো হলেও হঠাৎ দাম কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। পাট চাষে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজার দর নিম্নমুখী হওয়ায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা। দাম কমে যাওয়ায় হতাশাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন চাষিরা। ফলে চাষিদের সেই স্বপ্ননের সোনালি আঁশ গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী মৌসুম থেকে পাট চাষ ছেড়ে দেয়ার কথাও ভাবছেন বলে জানান অনেকে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর উপজেলায় ১৮৬০ হেক্টর জমিতে জিআর ও ৫২৪ জাতের এবং ১৫০ হেক্টর জমিতে তুষা ৮ রবি জাতের পাট চাষ করা হয়েছে।
উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের পাটচাষি জহির উদ্দীন বলেন, এবার চাষের শুরুতে চাষিদের বৈরী আবহাওয়া মোকাবেলা করতে হয়। বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ দিয়ে বীজ বুনতে হয়েছে। খরার সময়ে মাঝেমধ্যে সেচ দেয়ায় পাট চাষের খরচ বেড়ে গেছে। পাট চাষের সময় এবার নানা বিড়াম্বনার শিকার হয়েছিলাম, ভালো জো পাইনি। তারপর বড় সমস্যা পাট জাগ দেয়ার জায়গা পাওয়া যায়নি। খাল-বিল বেশির ভাগই জায়গা ভরাট হয়ে যাওয়ায় জাগ দেয়ার জায়গা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। এতে করে পাটের আবাদের প্রতি চাষিদের আগ্রহ কিছুটা কমে এসেছে। এখন প্রায় সব পুকুর-জলাশয় মাছ চাষের আওতায় এসেছে। ফলে মাছ চাষ করা পুকুর-জলাশয়ে পাট পচানো সম্ভব হচ্ছে না। বীজ বপনের সময় খরা হওয়ায় ঠিকমতো চারা গজায়নি। এতে ব্যাহত হয়েছে পাটের ফলন।
এ দিকে উপজেলার নারায়ণপুর, পাশাপোল, ধুলিয়ানী, স্বরুপদাহ, ফুলসারা, চৌগাছা সদর ও সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে বিভিন্ন এলাকায় পাট ধোয়া শুরু করেছেন। নতুন পাট বাজারে উঠতে শুরু করেছে। প্রতি মণ পাট এক হাজার ৯০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
রাজাপুর গ্রামের চাষি আতিয়ার রহমান জানান, প্রতি বিঘা জমিতে হালচাষ ও বীজ বপন থেকে শুরু করে সার-কীটনাশকের খরচ, পানি সেচ শ্রমিক খরচ ও জাগ দেয়া, (ধোয়া) আঁশ ছড়ানোসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত খরচ পড়েছে ১৫-১৬ হাজার টাকা। অথচ মৌসুমের শুরুতে বাজারে পাট দুই হাজার ৫০০-দুই হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও এখন তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৯০০- দুই হাজার টাকা দরে। অথচ গত বছরে এই পাট তিন হাজার-তিন হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি হয়। তিনি বলেন, পাটের দাম কম হলেও পাটকাঠির প্রচুর চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় পাটচাষিরা খরচ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। ছোট ছোট আঁটি হিসাবে ৩৫-৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সবজি ক্ষেতের মাচা তৈরিতে পাটকাঠির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া পাটকাঠি দিয়ে সহজে চুলা জ্বালানো যায় বলে গৃহিণীদের কাছে পাটকাঠির চাহিদা বেশি, তা ছাড়া বেড়াও দেয়া যায়।
নারায়ণপুর ইউনিয়নের বুন্দলিতলা গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে চাষি আবদার আলী বলেন, গত দুই বছরে পাটের দাম ভালো থাকায় এ বছরে জমি লিজ নিয়ে ২৫ কাঠা জমিতে পাট চাষ করি। বীজ রোপণ থেকে শুরু করে প্রতি মণ পাট ঘরে তুলতে প্রায় ২৫-২৭ শ টাকা খরচ হয়েছে। সেই পাট এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি এক হাজার ৬০০ টাকা। লোকসান দিয়েই পাট বিক্রি করতে হচ্ছে। একই এলাকার মাসুদর রহমান ও তবিবর রহমান, সাকুপুকুরিয়া ইউনিয়নের জাকির হোসেন, লাভলুর রহমান ও মুক্তার আহমেদ জানান, দাম কম থাকায় এ বছর পাট বাড়ি আনতে ইচ্ছে করছে না। তারা আরো জানান, শ্রমিক সঙ্কটের কারণে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে পাটের কাজ করাতে হচ্ছে। খেতের আশপাশে পানি না থাকায় দূরে নিয়ে জাগ দিতে হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাবদ আঁটিপ্রতি ৭-৮ টাকা খরচ হয়। অনেকে পুকুর ভাড়া করে পাট জাগ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এ বছর পাট চাষে চাষিদের বিঘাপ্রতি প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা লোকসান হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের আবাদ ভালো হয়েছে। সরকার পাটচাষিদেরও প্রণোদনা দিচ্ছে, যাতে নতুন জাতের পাটের চাষাবাদ বাড়ে। রবি-১ পাটের নতুন জাত। এর জন্য প্রণোদনা রয়েছে। পাটের দাম আপাতত কিছুটা কম হলেও দ্রুত দাম বেড়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। দাম বাড়লে চাষিরা লাভবান হবেন এবং ভবিষ্যতে উপজেলায় পাট চাষির সংখ্যা বাড়বে।
উপজেলা পাট উন্নয় কর্মকর্তা নিপা বিশ্বাস বলেন, উপজেলায় এ বছর দুই হাজার ৫৭৫ জন চাষি পাট চাষ করেছেন। এ অঞ্চলে এবার পাট ভালো হয়েছে। তবে পানি ও জায়গার অভাবে পাট জাগে সমস্যায় পড়েন চাষিরা।
পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশায় যশোরের চাষিরা
যশোরের চৌগাছায় পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লোকসানে চাষিরা। চলতি মৌসুমে পাটের আঁশ ভালো হলেও হঠাৎ দাম কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। পাট চাষে উৎপাদন...





