কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে ডাকাতিয়া নদী তীরবর্তী সাতটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে মানুষজনকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ‘ডাকাতিয়া নদীর পরিকোট অংশে একটি স্টীল সেতুর ওপর আরেকটি সেতু নির্মাণ, মাছ ধরার জন্য নদীতে বাঁশ দিয়ে বাধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত মৎস্য প্রজেক্ট এবং রাস্তার কালভার্ট বন্ধ করে নতুন বাড়িঘর তৈরি করার ফলে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার জলাঞ্চলখ্যাত বাঙ্গড্ডা, রায়কোট উত্তর, রায়কোট দক্ষিণ, মৌকরা, ঢালুয়া, বক্সগঞ্জ, সাতবাড়িয়া, পেড়িয়া, মক্রবপুর, হেসাখাল, আদ্রা উত্তর ও দক্ষিণ, জোড্ডা পশ্চিম ও দৌলখাঁড় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বেশিরভাগ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে ডাকাতিয়া নদী তীরবর্তী বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের পরিকোট পূর্ব পাড়ার ৬০টি পরিবারের প্রায় ৫০০০ লোক সম্পূর্ণ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া গান্দাছি, বেরী, শ্যামপুরেও বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি উঠেছে। সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া পূর্ব, পশ্চিম, দক্ষিণ, নাইয়ারা, তপোবন এবং সাজেনপুরের বাড়িঘর এবং রাস্তাঘাটে হাঁটু ও কোমর পানি উঠে প্রায় ১০ হাজার লোক পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। রায়কোট উত্তর ইউনিয়নের গাসিয়াল, খাঁড়ঘর, শ্রীরামপুর, দাসনাইপাড়া, রায়কোট দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ববামপাড়া, চান্দপুর, তুলাতুলী, মৌকরা ইউনিয়নের নারানদিয়া, পরকরা, গঙ্গারচর, গোরকমুড়া, পৌছির, মোড়েশ্বর, ঢালুয়া ইউনিয়নের বেরলা, পুঁটিজলা, চৌকুড়ী, চিলপাড়া, চরজামুরাইল, বক্সগঞ্জ ইউনিয়নের আলিয়ারা, মদনপুর, শুভপুর, অষ্টগ্রাম, বড়কালি, কদমতলী, হেসাখাল ইউনিয়নের পাটোয়ার, দায়েমছাতি, আদ্রা উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নের আদ্রা, চাটিতলা, মগুয়া, ভোলাইন, পুজকরা, মেরকোট, আটিয়াবাড়ি, মক্রবপুর ইউনিয়নের ভুলুয়াপাড়া মক্রবপুর গ্রামের বিভিন্ন বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি উঠেছে।

উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের বাঙ্গড্ডা-গান্দাছি সড়ক, বক্সগঞ্জ-সাতবাড়িয়া-গুনবতী সড়কের সাতবাড়িয়া সেতু থেকে সাতবাড়িয়া বাজার পর্যন্ত, চৌকুড়ি-সাতবাড়িয়া সড়কে পানি উঠেছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ছোট-বড় রাস্তায় পানি উঠায় মানুষজনকে চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নের বাহুড়া, জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়নের গোহারুয়া, মানিকমুড়া, মান্দ্রা এলাকার বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি উঠে এলাকাবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মৎস্য প্রজেক্টের মাছ ভেসে গেছে। রায়কোট দক্ষিণ ইউনিয়নের হক মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের পাড় ভেসে ৫০টি পুকুরের ছোট ও বড় মাছ ভেসে গেছে।

মৎস্য প্রজেক্টের মালিক ওবায়েদুল হক মজুমদার জানান, এতে করে এক কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

মৌকরা ইউনিয়নের গোরকমুড়ায় জে. কে এবং ভাই-ভাই মৎস্য খামারের ৪০ একরের ১০টি মৎস্য প্রজেক্ট ভেসে গেছে।

মৎস্য প্রজেক্টের মালিক কলিমউল্লাহ চেয়ারম্যান জানান, এতে প্রায় কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।

এছাড়া ভূঁইয়া মৎস্য প্রজেক্টেও প্রায় ২ কোটি এবং আনোয়ার হোসেনের মুকুলের প্রায় এক কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ছোট-বড় অনেক মৎস্য প্রজেক্টের মাছ ভেসে গেছে। এতে করে মৎস্য চাষিদের কোটি-কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে, মৎস্য চাষীরা এ প্রতিবেদককে জানান।

সাতবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী আরিফুর রহমান জানান, সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি উঠায় প্রায় ১০ হাজার মানুষকে পানিবন্দী অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে।

নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুরাইয়া আক্তার লাকি বলেন, ‘নাঙ্গলকোটের প্রায় এলাকায় পানি উঠেছে। বিভিন্ন সড়কের পাশে কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিচ্ছে। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিভিন্নস্থানে পানিবন্দী মানুষকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। আশা করছি, বৃষ্টি কমে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।