বাংলাদেশের বাইরে মালয়েশিয়া এখন অন্যতম শ্রমবাজার হিসেবে পরিগণিত। লাখ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে তারা। এতে একদিকে ক্রমবর্ধমান দেশে উদীয়মান বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে।

২০২২ সালে কলিং ভিসা চালুর পর ধাপে ধাপে শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের জন্যই চার লাখ ৭০ হাজারের কোটা অনুমোদন হয়েছে। মালয়েশিয়ার সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে যত জনশক্তি আমদানি করা হয়, বাংলাদেশ এখন ওই তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ ৩২ হাজার বাংলাদেশী কর্মী কলিং ভিসায় মালয়েশিয়া পৌঁছেছেন।

এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে নিযুক্ত (লেবার উইং) মিনিস্টার মো: নাজমুস সাদাত সেলিম।

সবচেয়ে বেশি প্রবেশ করেছেন কনস্ট্রাকশন সেক্টর। পাশাপাশি রয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর, সার্ভিস সেক্টর, ক্লিনার সেক্টর। তবে সিন্ডিকেটের কারণে কর্মী প্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা গুনতে হয়েছে প্রবাসীদের। এই খরচের টাকা তুলতে কর্মীদের কয়েক বছর লেগে যাবে। তাছাড়াও মালয়েশিয়ায় যারা পুরাতন কর্মী রয়েছেন এবং সিক্সপি ভিসা রিনিউ করতে পারেননি, তারাসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় সাত লাখ ২০ হাজার কর্মী বৈধ হওয়ার জন্য আরটিকে ২.০ তে আবেদন করেছেন।

কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রতি দিন হাজার হাজার কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করছেন। বিমানবন্দরে কথা হয় মালয়েশিয়ার অন্যতম কনস্ট্রাকশন কোম্পানি মিজান গ্রান্ড ইন্টারট্রেডার্স এর মাধ্যমে আসা কর্মীর সাথে। তারা বললেন, আমরা কোনো রকম ইমিগ্রেশন ঝামেলা ছাড়াই মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেছি। দাতুক মিজান বস আমাদের বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রিসিভ করেছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করে বলছেন, সব কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশের পর সাময়িকভাবে কাজের সঙ্কট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যে নিয়োগকর্তাদের নিজের কোনো কোম্পানি নেই বা আর্থিকভাবে লাভবান হতে কলিং ভিসায় কর্মী এনে অন্য কোম্পানিতে সাপ্লাই দিচ্ছেন। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা সব সময়ই আছে। বাংলাদশী কর্মীরা যে পরিশ্রম করে, মালয়েশিয়ানরা সেভাবে পরিশ্রম করতে পারে না। মালয়েশিয়ান সরকার তাদের নিজ দেশের কর্মীদের সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিলেও কনস্ট্রাকশন, পামওয়েল ও প্লানটেশন সেক্টরে তারা কাজ করে না বা এত পরিশ্রম করতে পারেন না। এসব সেক্টরে বাংলাদেশীরা কাজ করে। এজন্য নতুন করে আরো পাঁচ লাখ কর্মী প্রবেশ করলেও সাময়িক সঙ্কট সৃষ্টি হলেও এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কাজের সঙ্কট সৃষ্টি হবে না।

এদিকে বেশিরভাগ কলিং ভিসার কর্মী তাদের নিজ নিজ কোম্পানিসহ বাইরের কোম্পানিতে কাজ করছেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কিছু কিছু কোম্পানির নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের কাজ দিতে পারছেন না। তাদের মাসের পর মাস বসিয়ে রাখছেন। এজন্য তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন, কোম্পানির কথার সাথে বাস্তবে কাজের মিল পাচ্ছে না। তারা এতটা অসহায় কার কাছে কোথায় অভিযোগ করবেন, তারা বুঝতে পারছেন না। প্রথম দিকে কাজ না পাওয়ার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এখন কাজ না পাওয়ার অভিযোগ একটু কম। তাছাড়া পাহাড় জঙ্গলে ভরা মালয়েশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবর মিডিয়ায় আসে না। এ পর্যন্ত কাজ না পাওয়ার যত অভিযোগ কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে এসেছে, সবগুলো অভিযোগ খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দূতাবাস। এমনকি দূতাবাসের হস্তক্ষেপে কলিং ভিসার কর্মীদের তৎক্ষনাৎ কাজের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কলিং ভিসার শর্ত অনুযায়ী কর্মীরা কাজ পেয়েছেন কি না বিষয়টি জানতে সরেজমিন পরিদর্শন করেন প্রতিবেদক। এ সময় কোতাবারু প্রদেশে অবস্থিত মিজান গ্রান্ড ইন্টারট্রেডাসের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সরকারি প্রজেক্টে গেলে কর্মীরা বলেন, আমরা কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় আসার সাথে সাথে আমাদেরকে দাতু মিজান বস থাকার জায়গাসহ চুক্তি অনুযায়ী কাজ দিয়েছে। আমাদের বেতন ভাতা সঠিক সময়ে পাচ্ছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো: গোলাম সারোয়ার বলেন, মালয়েশিয়ায় নবাগত বাংলাদেশী প্রবাসী কর্মীরা ভালো আছেন। তারা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা, কর্ম পরিবেশ ও বেতন কাঠামো নিয়ে বাংলাদেশী কর্মীরা সন্তুষ্ট। তবে অভিবাসন ব্যয় আরো কমানো সম্ভব হলে শ্রমিককর্মীরা বেশি বেশি উপকৃত হতেন। এ বিষয়ে উভয় সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, খুবই স্বল্প সংখ্যক প্রবাসী মাঝে মাঝে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে হাই কমিশনের সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করেন। এক্ষেত্রে হাইকমিশন যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে মালয়েশিয়ার যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধান করছে। তবে এখন পর্যন্ত এই ধরনের সমস্যাগ্রস্থ কর্মীর সংখ্যা মোট আগত কর্মীর তুলনায় একেবারেই নগন্য।