এএফপি ও রয়টার্স
বিশ্ববাজারে জ্বালানির তীব্র সঙ্কট ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে ইউরোপের দুই শীর্ষ অর্থনীতি ফ্রান্স ও জার্মানির ওপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের নির্দেশ অনুযায়ী জাতীয় জরুরি ডিজেল মজুদ বাজারে না ছাড়লে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ডিজেল রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিশ্ববাজার পরিস্থিতি সামাল দিতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান বলে জানা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ হুঁশিয়ারি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। 
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র আনা-কাইসা ইতকোনেন বলেছেন, ‘আমরা ডিজেলের ওপর যেকোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছি। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কারো জন্যই লাভজনক হবে না। এটি একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আমাদের আস্থাকে ক্ষুণœ করবে।’ সদস্য দেশ ও কমিশনের মধ্যে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে আয়োজিত জরুরি আলোচনার পর তিনি আরো জানান যে, জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনে মজুদ ভাণ্ডার থেকে জ্বালানি ছাড়ের বিষয়ে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) সাথে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে ২৭টি দেশের এই জোট।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে নিজ দেশের বাজারে জ্বালানির দর কমানোকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেই কৌশল থেকেই আটলান্টিকের অপর পাড়ের মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। মূলত প্রতিরক্ষা ব্যয় ও শুল্ক নীতি নিয়ে মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সম্প্রতি যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে, এই নতুন সঙ্ঘাত সেই ক্ষতকে আরো গভীর করে তুলল। তবে মার্কিন নির্দেশ মেনে জ্বালানি ভাণ্ডার খালি করা নিয়ে মারাত্মক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একদিকে নিজ দেশের নাগরিকদের উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে স্বস্তি দেয়ার বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- দুই সঙ্কটের মাঝে দাঁড়িয়েছে জোটটি। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে না পৌঁছালে এই মজুদ খালি করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিদ্যমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর্যালোচনায় একটি জরুরি বৈঠকে বসেছে ইইউর ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ জ্বালানি টাস্কফোর্স। এর আগেই অবশ্য ইউরোপীয় কমিশন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর জ্বালানি তদারকি সংস্থা আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) থেকে এ পর্যন্ত মজুদ ব্যবহার করার সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জার্মানিকে দেয়া হয়নি। আইইএর পরবর্তী কৌশলগত বৈঠকের সময়সীমাও এখনো নির্ধারিত হয়নি। 
এদিকে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ অবমুক্তকরণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগে দেয়া প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন করেনি ফ্রান্স ও জার্মানি। মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে জানান, শোধনাগারজাত জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং গ্রাহক পর্যায়ে খরচ কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি মেনে চলাই ইইউর জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ইইউকে তাদের মজুদ থেকে প্রায় ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে উন্মুক্ত করার তাগিদ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ইউক্রেন সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপীয় অঞ্চলটি এখন জ্বালানির জন্য প্রায় পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ইউরোপের নিজস্ব রিজার্ভ ব্যবহারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। শীতকালীন হিটিং অয়েলের চাহিদা এবং কৃষি উৎপাদন মৌসুম শুরুর এই সময়ে মজুদ ডিজেল বাজারে আনার জন্য এটিই উপযুক্ত মুহূর্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সুর ধরা পড়েছে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্যেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, আইইএ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল উন্মুক্ত করে নিজ দায়িত্ব পালন করেছে; এবার মিত্রদেরও সেই কথা রাখা উচিত। বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে নতুন এই বিপর্যয়ের পেছনে কেবল ইরান যুদ্ধই নয়, ইউক্রেনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়াও তাদের ডিজেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা চলতি মাসজুড়ে বাড়িয়েছে। উপরন্তু, ঘরোয়া চাহিদা সামাল দিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্থগিত করেছে চীনও। ফ্রান্সের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ ইস্যুতে প্রাতিষ্ঠানিক মন্তব্য এড়িয়ে গেলেও প্যারিসের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক হলেও বিষয়টি তখন আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসেনি। তবে উত্তপ্ত বাজার নিয়ন্ত্রণে আইইএর সাথে সমন্বয় করে জরুরি রিজার্ভ ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্রুতই জি-৭ নেতাদের নিয়ে একটি বিশেষ ভিডিও কনফারেন্স আহ্বানের পরিকল্পনা করছেন ম্যাক্রোঁ।