ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম ও দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরালা রাজ্যের মুসলিম অধুষ্যিত অঞ্চলে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ধর্মীয় বিভাজন ও সংখ্যালঘুদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই সকল অঞ্চলে নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে দলটিকে।
এই মাসের শেষে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করতে খোদ নরেন্দ্র মোদিসহ শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতারা রাজ্যজুড়ে বিপুল প্রচারণা চালাচ্ছেন। একইসাথে তারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসামে ক্ষমতা ধরে রাখার এবং দেশটির দক্ষিণের কেরালায় দলের প্রভাব বিস্তারের।
২০১৪ সালের মোদি নির্বাচিত হবার পর উত্তর ও মধ্য ভারতের হিন্দু প্রধান এলাকাগুলোতে বিজেপি প্রচণ্ড প্রভাবশালী বড় দল। সামনে বিভিন্ন রাজ্যগুলোতে যে নির্বাচন হচ্ছে সেগুলোকে বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবা হচ্ছে। কারণ, দলটি এসব নির্বাচনের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে তাদের অবস্থান তৈরি করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী মোদিও বিজেপিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় দলে রূপান্তরিত করতে চান। তিনি কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে দেশের প্রধান দল করতে চান। কংগ্রেস যেমন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতার পর একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় দল হিসেবে ছয় দশক ধরে ভারত শাসন করেছে। মোদি চান বিজেপিও তেমনভাবে দেশ শাসন করুক।
শনিবার থেকে এ নির্বাচন শুরু হবে এবং একমাস ধরে নির্বাচন চলবে। আর ২ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে। কোনো কিছুই নাটকীয় দ্রুততার সাথে হবে না।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রতিপক্ষ দলগুলো লাঠি ও পাথর দিয়ে এক অপরকে হামলা করছে। তারা যানবাহনেও আগুন দিচ্ছে। এদিকে ৬৬ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে প্রচারণায় দৃঢ় নেতৃত্বে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। পায়ে আঘাত পেয়ে হুইলচেয়ার ব্যবহারে বাধ্য হলেও এই অবস্থাতেই নির্বাচনী প্রচারণায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিয়েছেন তিনি।
এই নির্বাচনগুলো এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন রাজধানী দিল্লির উপকণ্ঠে কয়েক মাস ধরে অবস্থান নেয়া হাজার হাজার কৃষকের বিক্ষোভ মোদি সরকারকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে। আর করোনা মহামারীতে এরমধ্যে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতের অর্থনীতি। এখনো বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রাম করছে ভারতের অর্থনীতি। মোদির জন্যও গুরত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি। কারণ তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছেন। এদিকে গত বছরে শুরু হওয়া করোনা মহামারী এখনো ভারত ছেড়ে যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে সমগ্র দক্ষিণ ভারতে বিজেপির ভালো করার কোনো সম্ভাবনা নেই। কমিউনিস্ট সরকার শাসিত কেরালায় তৃতীয় স্থান অর্জনের জন্য তারা লড়ছে। অপরদিকে এপ্রিলে তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপি ও প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ছোট শরিক হিসেবে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের সাথে জোট গঠন করেছে।
কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপি তার হিন্দু জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে ভোট টানতে চাচ্ছে। দলটি এসব রাজ্যে লাখ লাখ বাংলাভাষী মুসলমানদের 'বাংলাদেশী' বলে চিহ্নিত করে হিন্দুভোট টানতে চায়। ২০১৮ সালে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাদেরকে ‘ঘুন পোকার’ সাথে তুলনা করে বলেছিলেন, তারা ভারতের সম্পদ খেয়ে ফেলছে। মুসলিম বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে বিজেপি ২০১৯ সালে এক বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনও করেছিল। এ আইনে অন্য ধর্মের অবৈধ অভিবাসীদের ভারতে নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হলেও মুসলিমদের বাদ দেয়া হয়। সমালোচকরা এ আইনকে পক্ষপাতমূলক ও ভারতীয় সংবিধানবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।
ভারতজুড়ে মুসলিম জনসংখ্যা মোট ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ১৪ ভাগ। আর হিন্দু জনসংখ্যা হলো ৮০ ভাগের বেশি।
অন্যদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তিন রাজ্য- পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরালার মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ মুসলমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিক বলেন, ‘বিজেপি যদি বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোট নিজের পক্ষে টানতে পারে তাহলেই তাদের সাফল্য আসবে। অন্তত ৭০ ভাগ হিন্দু ভোটের অর্ধেক বিজেপিকে পেতে হবে।’
পশ্চিমবঙ্গে মোদির জন্য জয় লাভ করা খুবই কঠিন হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে রাজনৈতিক ধারা বিভিন্ন ইস্যুর থেকে ব্যক্তিত্বের দিকে ঝুকছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি এখন এ অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। তিনি দশ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। তিনি তিন দশক ক্ষমতায় থাকা সমাজতন্ত্রীদের হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন।
কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান করে ২০১৬ সালে আসামে প্রথমবারের মতো ক্ষমতা পায় বিজেপি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন বিজেপি আবারো চরম হিন্দুত্ববাদী নীতির মাধ্যমে আসামের নির্বাচনে জয়ী হতে চাইবে। তারা অবৈধ বাংলাদেশী ইস্যুকে কেন্দ্র করে হিন্দুভোট পেতে চায়।
গোয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বিজ্ঞানের প্রফেসর অখিল রঞ্জন দত্ত বলেন, এবার কংগ্রেস একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দলের সাথে জোট গড়েছে। এ কারণে আসামেও জয় লাভ করতে অনেক কষ্ট করতে হবে বিজেপিকে।
সূত্র : স্টার ট্রিবিউন






