গত ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি গবেষণার বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছিল, কাশ্মির বিরোধের জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।
এদিকে গত ২২ এপ্রিল ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর থেকে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ- ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরে প্রথমে মিসাইল আক্রমণ চালায় ভারত। জবাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে পাকিস্তানও।
বিবিসির সেই প্রতিবেদনে গবেষকদের বরাত দিয়ে আরো বলা হয়, এর ফলে জলবায়ুর ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তাতে অনাহারে মারা যাবে আরো বহু কোটি মানুষ। এরকম এক বিপর্যয়ের ধারণা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর এই দু’টি দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। এই যুদ্ধ কিভাবে শুরু হবে তার কিছু কাল্পনিক দৃশ্যও গবেষকরা প্রকাশ করেছিলেন।
দৃশ্য-কল্প ১:
ভারতীয় পার্লামেন্টে বোমা হামলা চালাবে একজন ‘সন্ত্রাসী’। নিহত হবেন ভারতীয় নেতারা। জবাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের ভেতরে প্রবেশ করে আক্রমণ চালাবে। নিজেদের রক্ষার্থে পারমানবিক বোমা ব্যবহার করবে পাকিস্তান। এরপর ভারতও তাদের পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করবে। দু’টি দেশই তখন তাদের কাছে যত পরমাণু অস্ত্র আছে সেসব নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
দৃশ্য-কল্প ২:
কাশ্মিরে আক্রমণ করবে ভারত। তারপর শুরু হয়ে যাবে পারমাণবিক যুদ্ধ। তবে উভয় দেশে যদি বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন নেতারা ক্ষমতায় থাকেন তাহলে হয়তো এরকম কিছু হবে না এবং একারণেই এতদিন সেরকম কিছু হয়নি।
কিন্তু এমন আরো নানা রকমের কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা যায়, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই গবেষণার সাথে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অ্যালান রোবোক বলেছিলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে। শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, এসব অস্ত্রের বিস্ফোরণের শক্তিও তারা ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে। ফলে তাদের আশঙ্কা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেই এই যুদ্ধের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।’
যুদ্ধের এসব দৃশ্য-কল্প কিভাবে তৈরি করা হয়েছে? এসব কী নিছকই কিছু নাটক?
গবেষক অ্যালান রোবোক বলেছিলেন, কিছু পেশাজীবীকে নিয়ে তারা ওয়ার্কশপ করেছেন যেখানে এসব সম্ভাব্য কারণের কথা উঠে এসেছে।
তিনি আরো বলেছিলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়া কয়েকজন জেনারেলকে আলাদা আলাদা দু’টি কক্ষে বসিয়ে দেয়া হয়। এক পক্ষকে বলা হয় যেসব কারণে যুদ্ধ হতে পারে তার কিছু ধারণা দিতে। তারপর সেগুলো অন্য আরেকটি কক্ষে অপর গ্রুপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় সেরকম কিছু হলে তারা কী করবেন? এরকম আলোচনার ভিত্তিতেই এসব কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।’
তবে তিনি বলেছিলেন, ‘এগুলো কিছু দৃশ্য-কল্প। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই হয়তো কিছু হয় না। নেতারা ঠান্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কিন্তু কখনো কখনো পরিস্থিতি তো নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে!’
কেন ২০২৫?
গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, ২০২৫ সালেই যুদ্ধে জড়াতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার চির-বৈরি দু’টি দেশ- ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধের এই সময় কিভাবে নির্ধারণ করা হলো?
অধ্যাপক রোবোক বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ থেকে তারা শুধু একটি বছরকে বেছে নিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ যেকোনো সময়ে লাগতে পারে, হতে পারে আগামীকালও। ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো তথ্য থাকে না। কখন কী হবে সেটাও কেউ বলতে পারে না। সেকারণে আমরা কিছু দৃশ্য-কল্প ব্যবহার করেছি কী হতে পারে সেটা বোঝার জন্যে। সেই সম্ভাবনার কথা চিত্রিত করতে আমরা শুধু একটা সময়কে বেছে নিয়েছি।’
আসলেই কি ২০২৫ সালে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারে?
ভারতীয় সেনা বাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি বলেছিলেন, এই গবেষণা একেবারেই কাল্পনিক, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তিনি বলেছিলেন, ‘লোকেরা ভাবছেন দু’টি দেশের আণবিক বোমা আছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো নয়, তার মানে পাঁচ ছ’বছর পর তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবে।’
তবে তিনি বলেছিলেন, ২০২৫ সালে না হলেও যেকোনো সময় এই দু‘টি দেশের মধ্যে যুদ্ধ হতে পারে।
ওই গবেষণার সাথে একমত প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানে কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. পারভেজ হুডভাই। তিনি বলেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধের সম্ভাবনা সবসময়ই আছে।






