নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন গত বছরের জুন মাসে। তার দল বিজেপি যদিও সেই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, কিন্তু তেলুগু দেশম বা জনতা দল ইউনাইটেডের মতো শরিকদের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়ার ক্ষেত্রে তার কোনো সমস্যাও হয়নি।

কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে তার শাসনকালে পাঁচ বছরের মধ্যে এখনো ১৫ মাসও অতিক্রান্ত হয়নি, এর মধ্যেই দেশের বিরোধী দলগুলো জোরেশোরে মোদির ইস্তফাও দাবি করতে শুরু করে দিয়েছেন। লোকসভায় বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী বেশ কিছুদিন ধরেই লাগাতার বলে চলেছেন, ২০২৪-এর যে সাধারণ নির্বাচনে জিতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন– সেই ভোট হয়েছে আগাগোড়া ভুলে ভরা একটা ভোটার তালিকার ভিত্তিতে। আর এই ‘ভুল’টা যে নির্বাচন কমিশনের ইশারাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে করা, সেই ইঙ্গিত দিতেও তিনি কোনো দ্বিধা করছেন না।

গতকাল বুধবার বিহারের মুজফফরপুরে এক নির্বাচনি সভা থেকে তিনি আরো অভিযোগ করেন, বৈধ ভোটারদের ভোট কেটে আর জাল ভোটারদের নাম তালিকায় যোগ করেই মোদি ভোটে জিতেছেন। আর এ কাজে তাকে সাহায্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আর দেশের নির্বাচন কমিশন।

কংগ্রেসের সাথে অনেক বিষয়ে মতভেদ থাকলেও দেশের আর একটি বড় বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু এই প্রশ্নে রাহুল গান্ধীর পাশেই দাঁড়িয়েছে। ডিএমকে ও আরজেডি’র মতো দলগুলোরও সমর্থন পাচ্ছেন তিনি।

তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেক ব্যানার্জী সাংবাদিক সম্মেলন করে কয়েকদিন আগেই বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যদি মেনেই নেয় দেশের ভোটার তালিকায় প্রচুর অসঙ্গতি আছে এবং যেহেতু বর্তমান সরকার সেই তালিকার ভিত্তিতে করা ভোটে জিতেই ক্ষমতায় এসেছে, তাহলে সেই সরকারের কোনো বৈধতা ধাকতে পারে না।

‘সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার পুরো মন্ত্রিসভার পদত্যাগ করা উচিত এবং লোকসভা অবিলম্বে ভেঙে দেয়া উচিত’– এই দাবিও তুলেছেন অভিষেক ব্যানার্জী।

ভোট চুরির অভিযোগ, এসআইআর বিতর্ক

বিরোধীদের তোলা এই ভোট চুরির অভিযোগ ক্রমশই ‘মোমেন্টাম’ পাচ্ছে, আর তা দৃশ্যতই অস্বস্তিতে ফেলছে মোদি সরকারকে। একটানা ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তবে এর আগে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আর কোনো বিষয় তাকে এতটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেনি।

ক্ষমতাসীন বিজেপি যদিও রাহুল গান্ধীর তোলা ভোট চুরির অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে, কিন্তু বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকায় যে ব্যাপক সংশোধন (এসআইআর) দরকার, সেই দাবিতেও সমর্থন জানাচ্ছে তারা। জাতীয় নির্বাচন কমিশনও মেনে নিয়েছে, কোনো কোনো রাজ্যের ভোটার তালিকায় প্রচুর ভুয়া নাম আছে। সেগুলো বাদ দিতেই এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা প্রয়োজন- সোজা কথায় তালিকায় কাটছাঁট করা দরকার।

বিহারে আগামী নভেম্বরেই ভোট হওয়ার কথা। তার আগে সে রাজ্যে কমিশনের পক্ষ থেকে যে এসআইআর চালানো হয়েছে তাতে প্রাথমিকভাবে ৬৫ লাখেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। আর বিরোধীরা ঠিক এই কারণেই প্রশ্ন তুলছেন, বিহার বা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন তালিকা ভুল, কিন্তু মহারাষ্ট্র বা গুজরাটের ভোটার তালিকা নিখুঁত– এটা কিভাবে হতে পারে?

২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে– এই ধারণা যতই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততই মোদির ইস্তফা ও লোকসভা ভেঙে দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

গুজরাট মডেলের ভোট চুরি

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দিন দশেক আগেই বিহারে তার ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’ শুরু করেছেন। এর অংশ হিসেবে ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন জেলায় পদযাত্রা ও সমাবেশ করছেন।

বুধবার বিহারের মুজফফরপুরের সমাবেশ থেকে তিনি বলেন, ‘এই ভোট চুরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গুজরাট থেকে, যখন নরেন্দ্র মোদি ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ সালে সেই মডেল গুজরাট থেকে জাতীয় স্তরে আমদানি করা হয়। আমি তো বলব গুজরাট মডেল কোনো অর্থনৈতিক মডেল নয়, এটা হলো সোজাসুজি ভোট চুরির মডেল।’

মোদি জাতীয় স্তরেও যতগুলো ভোটে জিতেছেন (২০১৪, ২০১৯, ২০২৪), তার সবগুলোতেই এই মডেলের আশ্রয় নিয়েই জিতেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গত দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র বা গুজরাটে যেসব বিধানসভা ভোট হয়েছে এবং ২০২৪ সালে যে লোকসভা ভোট হয়েছে– সেগুলোর সবই ‘চুরি করে’ বিজেপিকে জেতানো হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন তাতে ‘সহযোগী’র ভূমিকায় ছিল বলেও মন্তব্য করেন রাহুল গান্ধী।

ভোট মিটে যাওয়ার এতদিন বাদে তিনি মুখ খুলছেন কেন, আজ সে প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা। তিনি বলেন, ‘এতদিন কিছু বলিনি কারণ আমাদের হাতে প্রমাণ ছিল না। কিন্তু অবশেষে মহারাষ্ট্রে এসে আমরা প্রমাণ পেয়ে গেছি, কারণ সেখানে তারা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল।’

‘লোকসভা নির্বাচনের পর মহারাষ্ট্রের ভোটার তালিকায় অন্তত এক কোটি অতিরিক্ত নাম যোগ করা হয়েছে। যার পুরোটাই বিজেপির ঝুলিতে গেছে।’

‘মহারাষ্ট্র ও বিধানসভার বিধানসভা ভোট এবং ২০২৪-র লোকসভা ভোট কিভাবে চুরি করা হয়েছে, খুব শিগগিরি তার প্রমাণ আপনাদের সামেন পেশ করবো’, জনসভা থেকে ঘোষণা করেন রায়বেরিলি আসনের এমপি রাহুল গান্ধী।

ডিএমকে, আরজেডি, তৃণমূলের সমর্থন

ভারতের লোকসভায় শক্তির বিচারে কংগ্রেসের পরেই যে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান, সেই ডিএমকে, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি ও আরজেডি প্রত্যেকেই রাহুল গান্ধীর এই ভোট চুরির অভিযোগে সমর্থন জানাচ্ছে। বুধবার মুজফফরপুরের সমাবেশে ডিএমকে নেতা ও তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী স্টালিনও উপস্থিত ছিলেন, তিনি রাহুল গান্ধীর তোলা প্রতিটি অভিযোগেই সায় দিয়েছেন।

তাছাড়া বিহারে কংগ্রেসের ভোটার অধিকার যাত্রায় আগাগোড়াই রাহুল গান্ধীর সাথে আছেন আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। তার দল রাজ্যে কংগ্রেসের জোটসঙ্গীও বটে।

এদিকে তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জী এর আগেই দাবি করেছেন, ভোটার তালিকায় ‘এসআইআর’ যদি করতেই হয়, তাহলে নির্দিষ্ট একটি বা দুটি রাজ্যে নয়, পুরো দেশেই সেটা করতে হবে আর সেই প্রক্রিয়ার সূচনা হতে হবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে।

‘নির্বাচন কমিশন বলছে ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি ছিল, তাই এসআইআর দরকার। বেশ, তাহলে শুধু বিহারে বা পশ্চিমবঙ্গে কেন, গোটা দেশেই তালিকা সংশোধন হোক এবং লোকসভা ভেঙে দেয়া হোক’, প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

এই ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই যে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার দলের ২৪০ জন এমপি লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, আর তারাই দেশের প্রেসিডেন্ট বা ভাইস-প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করছেন সেটাও মনে করিয়ে দেন অভিষেক ব্যানার্জী।

বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফার দাবিকে আমলই দিচ্ছে না। বিজেপির মুখপাত্র শাহনাজ পুনেওয়ালা এদিন রাহুল গান্ধীর গুজরাট মডেলে ভোট চুরির দাবিকে নস্যাৎ করে পাল্টা দাবি করেছেন, ‘নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তার মধ্যে বেশিটা সময়ই, ২০০৪ থেকে ২০১৪, কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল।’

‘তখন নির্বাচন কমিশনারদেরও নিযুক্ত করেছিল কংগ্রেস সরকার। তো রাহুল গান্ধী কি বলতে চাইছেন তাদের আমলের কমিশনাররাই গুজরাটে মোদিজিকে ভোট চুরি করিয়ে জিতিয়েছেন?’, পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন তিনি।

বিজেপি নেতা আর পি সিং আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম এস গিলকে অবসরের পর কংগ্রেসই এমপি করে এনে মনমোহন সিংয়ের ক্যাবিনেটে মন্ত্রী বানিয়েছিল। অন্যদিকে বর্তমান নির্বাচন কমিশন এর আগে গত ১৭ অগাস্ট সাংবাদিক বৈঠক করে ঘোষণা করেছিল, পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে রাহুল গান্ধী তার অভিযোগের স্বপক্ষে নিয়মমাফিক হলফনামা পেশ না করলে তারা ধরে নেবে সেই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

সেই সময়সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। রাহুল গান্ধী হলফনামাও দেননি বা ক্ষমা চেয়ে অভিযোগও প্রত্যাহার করেননি এবং কমিশন স্পষ্ট করে দিয়েছে তার তোলা অভিযোগগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত হবে না।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মোদি সরকার ও বিজেপি বিরোধীদের দিক থেকে আসা এই শক্ত চ্যালেঞ্জকে কিভাবে মোকাবেলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র : বিবিসি