রাজনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যেখানে বহুদিনের অর্জন সামান্য ভুলে এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। শেখ হাসিনা ১৬ বছরে স্বৈরাচারের সব অস্ত্র ব্যবহার করে শাসন করার ভিত এতটাই শক্তিশালী করেছিল, রাষ্ট্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠান তার কথাতেই ওঠবস করত। উন্নয়ন-উন্নয়নের জিকির তুলে উন্নয়নের জননী তকমা দিয়ে তাকে এতটাই মগ্ন করে রাখা হতো যে, তিনি উন্নয়নের বাইরে আর কিছুই দেখতে পেতেন না। উন্নয়নকে কার্যত মুদ্রা পাচার করার মেশিনে পরিণত করেছিলেন। শেখ হাসিনার ঘরের লোক থেকে শুরু করে দলের চ্যালা-চামচারা এমনকি খোদ শেখ হাসিনা ও তার ছেলে-মেয়েও এই লুটপাট এবং অর্থপাচারের সাথে জড়িত ছিল। রাষ্ট্রের সব যন্ত্রকে বিরোধী দল দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনীতিকে নিশ্চিহ্ন করে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার স্বপ্নে বিভোর ছিল শেখ হাসিনা। কিন্তু তিনি জানতেন না তার এই স্বপ্ন ছিল বালির বাঁধ, যা জোয়ার এলেই ভেঙে তছনছ হয়ে যাওয়ার।

দুনিয়াখ্যাত পপ-তারকা মাইকেল জ্যাকসন ১৫০ বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন। তাই সবসময় তিনি সতর্ক থাকতেন। কারো সামনে যাওয়ার আগে মুখে মাস্ক পরে নিতেন। হাত মেলানোর সময় পরে নিতেন দস্তানা। নিজের দেখাশোনা করার জন্য বাড়িতে অত্যন্ত দক্ষ স্বনামধন্য ১২ জন ডাক্তার নিযুক্ত করেছিলেন, যারা তার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত পরীক্ষা করতেন। যখন যেটা খেতেন, সেই খাবার তার টেবিলে দেয়ার আগেই ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করে আনা হতো। ব্যায়াম করানোর জন্য ১৫ জন প্রশিক্ষক কসরত করতেন। যদি কোনো দুর্ঘটনায় তার কোনো অঙ্গহানি ঘটে, সে জন্য আগে থেকেই অর্গান ডোনার রেডি করে রেখেছিলেন। যাতে হঠাৎ দরকার পড়লেই ওরা কিডনি, লাঙস, চোখসহ শরীরের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাকে দিতে পারেন। ওদের সব খরচ তিনি বহন করতেন। তবু তিনি পারলেন না। হেরে গেলেন। ২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে হৃৎপিণ্ড তার স্তব্ধ হয়ে গেল। ১৫০ বছর বেঁচে থাকার সব পরিকল্পনা পঞ্চাশেই শেষ হয়ে গেল।

হাসিনাও একটানা ৩৩ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য রাষ্ট্র যন্ত্রকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। বেনজির-হারুন-আব্দুল্লাহ আল মামুন-বিপ্লবসহ সব পুলিশ, র‌্যাবকে ব্যবহার করে রাজপথ পরিষ্কার রাখতে চেয়েছিল। যারা মুখ দিয়ে সরকারবিরোধী কথা বলত এবং সরকারের অপকর্মের বিরুদ্ধে কলম দিয়ে লিখত তাদের দমিয়ে রাখার জন্য আইন তৈরি করে লাল দেয়ালে বন্দী রাখার ব্যবস্থা করেছিল। যাকে বেশি হুমকি মনে হতো তাকে গুম করে দুনিয়া থেকে বিদায় করাও ছিল তার জন্য মুহূর্তের খেলা। এত কিছু করেও ছোট্ট ভুলে মাত্র ১৬ বছরের মাথায় শুধু ক্ষমতাই ছাড়তে হয়নি, দেশ ছেড়েও পালাতে হয়েছে। অথচ বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের নেতা থেকে শুরু করে একজন সমর্থকের যে দাপট ছিল, তাদের ভয়ে তটস্থ থাকত রাষ্ট্রের ১৭ কোটি মানুষ। এখন কিছুই নেই। আওয়ামী লীগের নাম নেয়ার লোকটাকেও এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকের মতোই হাসিনাও তার দেশের জনগণকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার স্বভাবসুলভ ভাষায় ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি মেনে না নিয়ে; বরং তাদেরকে রাজাকারের সন্তান বলার খেসারত দিতে হয়েছে। তাদের দলের অনেকেই এখন বলে থাকেন শেখ হাসিনা ভুল করেছেন। তাদের ভাষায়, ছাত্রদের দাবি মেনে নিলে এমনটি হতো না। হয়তো শেখ হাসিনাও এখন মোদির আশ্রমে বসে গুনগুনিয়ে গাইছেন, ‘ভুল সবই ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা, সে ভুল, সবই ভুল...। ’

দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকই ভুল করে থাকে; কিন্তু তারা তাদের ভুলটা বুঝতে পারে না। হিটলার থেকে মুসোলিনি, গাদ্দাফি থেকে সাদ্দাম হোসেন, চসেস্কু থেকে পিনোশে যারাই স্বৈরশাসনের তলোয়ার হাতে নিয়ে নির্মমভাবে মানুষের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করেছে তাদের সবার পরিণতি প্রায় একই রকম হয়েছে। কেউ পালিয়ে গিয়ে জীবনটা বাঁচিয়েছেন, কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে কেউবা জনতার হাতে পিটুনি খেয়ে মরেছেন, কেউবা করেছেন আত্মহত্যা। নিজেদের এভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের দলের অস্তিত্বও নাই হয়ে গেছে। ৪ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত দোর্দণ্ড প্রতাপের আওয়ামী লীগ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে কোথায় হারিয়ে গেল তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াও দায়। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত শেখ মুজিবের বেপরোয়া শক্তিশালী বাকশাল ১৫ তারিখ সকাল হওয়ার আগেই বাংলাদেশের জমিন থেকে প্রায় নিচিহ্ন হয়ে গেল। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে জনগণের অধিকার বিলুপ্ত করার স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এই দেশের জনগণ কোনোকালে মেনে নেয়নি বলেই যুগে যুগে সব স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হয়েছে। পাকিস্তান আমলের আইয়ুব খান, বাংলাদেশের এরশাদ কেউই গণ-আন্দোলন থেকে রেহাই পাননি। দিন শেষে তাদের নির্মমভাবে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে। মূল কথা হচ্ছে, কেউ গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে পারেনি।

হার্ভার্ডের একজন গবেষক দেখিয়েছেন কোনো জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যদি গণবিক্ষোভে যোগ দেন, তাতেই তারা সফল হতে পারেন। হাসিনার বিরুদ্ধেও প্রথম দিকে সব মানুষ রাজপথে নেমে আসেনি। কিছু ছাত্র-জনতা সাহস নিয়ে নেমে আসার পর যখন হাসিনার পরাজয় অনেকটা সন্নিকটে চলে আসে তখন লাখ লাখ লোক রাজপথে নেমে এসেছিল। ফলে হাসিনার পরাজয় নিশ্চিত হয়। চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের পতন ঘটেছিল গণ-আন্দোলনের মুখে। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয় সফল আন্দোলনের মাধ্যমে। আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল তিউনিসিয়ায় স্বৈরশাসক জয়নাল আবেদিন বেন আলিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মাধ্যমে। সুদানে আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে ওমর আল-বশিরকে। একইভাবে আলজেরিয়ায় ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে আবদুল আজিজ বুতেফ্লিকাকে। হাসিনার পতনের দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কার প্রভাবশালী স্বৈরতান্ত্রিক রাজাপাকসে গোতাবায়েকে গণবিপ্লবের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তরুণের জেগে ওঠার উন্মাদনার কাছে অন্যায়ের শিকল খুব বেশি শক্ত নয়। জোরে ধাক্কা দিলেই ছিঁড়ে যায়। পাকিস্তানের নির্বাসিত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ভাষায় বলতে হয়, নিশ্চিত জানি, আমরাও দেখব- সব মুকুট ছুড়ে ফেলা হবে, সব সিংহাসন গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।

একটি সফল গণবিপ্লবের মাধ্যমে অত্যাচারী শাসককে পরাভূত করার পরও অনেকসময় প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে আরেকটি গণবিরোধী শক্তির কাছে ক্ষমতা চলে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে পথ চলাই উত্তম। আজকের বাংলাদেশে হাসিনা পতনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের মধ্যে যে অনৈক্যের সুর শোনা যাচ্ছে তাতে সুযোগ পেলেই পতিত ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কাজেই বিপ্লবের এই সফলতাকে ধরে রাখার জন্য ঐক্য খুব বেশি প্রয়োজন। তবে মনে রাখা দরকার ঐক্য ধরে রাখার জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা খুব বেশি প্রয়োজন।
জাতি গঠনের জন্য হয়তো ঐক্যবদ্ধ থাকা খুব বেশি প্রয়োজন; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ইতিহাসের দায় থেকে কেউ মুক্তি পেয়ে যাবে। কাজেই ছাত্র-জনতা এবং দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ফসল যেন কোনো একক শক্তির ঘরে না নেয়ার চেষ্টা করা হয়। তাহলে যে অনৈক্য এবং রাজনৈতিক বিভেদ দেখা দেবে তাতে আমাদের সব রক্ত ও জীবন দান বৃথা যাবে এবং আবারো আরেকটি গণবিরোধী ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদের জননী পালিয়ে গেছে; কিন্তু ফ্যাসিবাদের জীবাণুরা বেঁচে আছে।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট