পিঠ দেখানো নয়, দিল্লির চোখে চোখ রেখে কথা বলছে এখন ঢাকা। কখনো সমানে সমানে, কখনো কৌশলী কূটনীতিতে ভারতকে মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। ভারতের খাস পছন্দের এবং নিয়োগ করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের লজ্জাজনক পরিণতি সইতে পারছে না ভারত। তার ওপর একের পর এক বাংলাদেশের দৃঢ়ভাব সহ্য করা বিষ খেয়ে বিষ হজমের মতো অবস্থা দিল্লির; কিন্তু পাল্টাব্যবস্থা বা প্রতিশোধের কোনো উপায় পাচ্ছে না।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লিতে বসে হাসিনা নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের তীর ছুড়েছেন বাংলাদেশের দিকে। প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। পাচার করা টাকা খরচ করে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন। সজীব ওয়াজেদ জয় কোটি কোটি টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছেন। সেটিও কার্যত ব্যর্থ হয়েছে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশে। হাসিনার রাজনীতিতে জাতিসঙ্ঘ কার্যত শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ তার সরকারের ভারতভীতি এর মধ্যে কমে এসেছে। ট্রাম্প-মোদির বৈঠকের চব্বিশ ঘণ্টা না পেরুতে দ্বিতীয় দফায় ভারতীয় অভিবাসীদের সামরিক বিমানে হাতকড়া ও শিকলে পা বেঁধে ফেরত পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই ভয় আরো কাটিয়ে দিয়েছে। ভারতের এখন অপেক্ষা কবে সরবেন ইউনূস? তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ধারে কাছে নেই মোদির গ্রহণযোগ্যতা। চব্বিশের বিপ্লব ও ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা ভারতকে কাবু করে দিয়েছে কেবল আঞ্চলিক রাজনীতিতে নয়, বিশ্ব-রাজনীতিতেও। তাই বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারকে নাকানি চুবানি খাইয়ে বিদায় করে দ্রুত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ভারতের। ড. ইউনূস নির্বাচন দিয়ে সরে গেলে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসুক, তখন অনেক কিছু করার থাকবে বলে অপেক্ষায় ভারত।

নানা ঘটনাপরিক্রমায় বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয়ে রেখে ঢাকার সাথে সম্পর্ক ভালো করা অসম্ভব তাও বুঝতে বাকি নেই ভারতের। তার পরও হাল ছাড়ছে না। আবার শেখ হাসিনাকেও স্টেটলেস করতে চায় না। তাকে আশ্রয়ে রেখে জোড়াতালিতে হলেও খাতির জমাতে নানা পর্যায়ে কথা হচ্ছে। সম্পর্ক নিবিড় করার কূটনৈতিক বয়ান দিচ্ছে। দিল্লির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি ঢাকা সফর করে গেছেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর ঘনিয়ে আসা ‘কালো মেঘ’ দূর করার কথা শুনিয়েছেন। জানিয়ে গেছেন ‘একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলার আহ্বান। দেশে-বিদেশে আরো নানা পর্যায়ে দূতিয়ালি হচ্ছে। আবার বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায়ও ক্ষান্ত হচ্ছে না দিল্লি। নানা ছুতায় ও গুজবে বাংলাদেশকে অস্থির রাখার চেষ্টা করছে। সেই আলোকে সাফল্য পাচ্ছে না; বরং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আরো দৃঢ় হচ্ছে। তারপরও ভারত হাল ছাড়ছে না।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, হালনাগাদ ভারত মাথা ঢুকিয়েছে নির্বাচনী রাজনীতির নতুন বাঁকে। সংস্কার, নির্বাচন, আগে স্থানীয় সরকার না জাতীয় নির্বাচন- এসব প্রশ্নে তেল ঢালছে। নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী জাতীয় সংসদে আসন বণ্টন, জাতীয় নির্বাচন আগে না স্থানীয় নির্বাচন আগে এসব নিয়ে অযথা নানা প্রশ্ন তৈরি করা হচ্ছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ ঘেরাটোপে পড়েছে। তারা কথামালার রাজনীতিতে সংস্কার ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে নানা দাবির ঢোলে ধাঁধা তৈরিতে তাল দিচ্ছে। আসলে নির্বাচন, সংস্কার, ফ্যাসিস্টের বিচার একটিও মূল উদ্দেশ্য নয় ভারতের। মূল উদ্দেশ্য গণ্ডগোল পাকানো। আওয়ামী লীগ যেন সামনের নির্বাচনে আসতে পারে, সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে তা নিশ্চিত করা এ ঢোল-তবলার বেসুরা গীতের মতলব হতে পারে। সেই টার্গেট মতো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ আরো নানা ইস্যু তাজা রাখা হচ্ছে।

সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে- সংস্কার, ফ্যাসিস্টের বিচার ও নির্বাচন একসাথে চলবে। এগুলোর কোনোটি একটির সাথে আরেকটি সাংঘর্ষিক নয়। সংস্কার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যতটুকু সংস্কার চাইবে ততটুকু সংস্কারের পর নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোই করবে মূল সংস্কার। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘তার সরকার সেকেন্ড ইনিংস শুরু করেছে। নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।’
বলার তো আর কিছু বাকি রাখেননি। প্রায় সবই পরিষ্কার। এর পরও নানা গীত-বাজনা। কে না বোঝে, সংস্কার মূলত চলমান প্রক্রিয়া। শুধু রাজনীতি নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কার অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সংস্কার কমিশনগুলো রিপোর্টও জমা দিয়েছে। সংস্কার ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশন এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠক করেছে। একটি ফলপ্রসূ বৈঠকের পরও নানা দ্বিধা-সন্দেহ তৈরির অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সঙ্ঘাতের মতো ঘটনা ঘটছে।

এ দিকে দৃশ্যত অগ্রাহ্য-তাচ্ছিল্য করলেও, নানা অভিযোগ রটলে-রটালেও জুলাই-আগস্ট বিপ্লবী ছাত্রদের গড়তে যাওয়া দল নিয়ে উদ্বিগ্ন মূলধারাসহ সহযাত্রী আশপাশের রাজনীতিকরা। ছাত্ররা নতুন রাজনৈতিক দলই নয়, একটি ছাত্র সংগঠনও রাখবে। এর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাজনীতিকদের। আবার তাদের প্রতি প্রধান উপদেষ্টার আশীর্বাদ নিয়ে রাখঢাক নেই।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তখন কোনো প্রশ্ন ছিল না। ছাত্ররা বিজয়ী হতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় ছিল। কারণ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন আন্দোলনে অতীতে বারবার রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গুলির সামনে দাঁড়ানোই নয়, অকাতরে প্রাণ দেয়ার দৃষ্টান্ত তারা ছাত্রদের মতো দেখাতে পারেনি। যার জেরে অবিশ্বাস্য সাফল্য ছাত্রদের। এখন তাদের নতুন সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়েও সন্দেহ। সাথে বিরোধিতা-সমালোচনা মশকরাও। ছাত্রদের সেই সময়ের ক্রেজ ও জনসমর্থন এখন নেই বলে মূল্যায়ন রাজনীতিকদের। একসময় তাদের সক্ষমতা নিয়ে যে পরিমাপ ছিল তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।
১৫-১৬ বছর আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে পরীক্ষায় অনেকের অকৃতকার্যতার মধ্যে ছাত্রদের ওই সাফল্যের পেছনের কারণটি অনেকে উপলব্ধি করতে পারেন না। তাদের জেনারেশন গ্যাপ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া আমূল পরিবর্তনের সাথে ধাতস্থ হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা ড. ইউনূস নিয়মিত স্বীকার করছেন। দল করার ব্যাপারে তাদের নিরুৎসাহিত করেননি। এ ব্যাপারে পরামর্শও রয়েছে তার। এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বড়রা (রাজনৈতিক দলগুলো) হয়তো চব্বিশের রক্তের অঙ্গীকার রাখতে পারবে না। সেই অঙ্গীকার ছাত্রদের ধরে রাখতে হবে। ছাত্রদের দলটি হতে যাচ্ছে মধ্যপন্থার। না ডান, না বাম। তবে, ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী। ভারত মন্দ যা চাইবে তার বিপরীতটা করার তাদের মানসিকতা। কারো লেজুড়বৃত্তি না করে স্বতন্ত্র-স্বাধীন থাকবে বলে অঙ্গীকার তাদের।

এ অভিযাত্রায় পুরনো টিকিটের আর ভ্যালু থাকছে না। নতুন দল করতে যাওয়া নেতৃত্ব ফ্যাসিস্ট হটানোয় অভিজ্ঞ। তবে, কখনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেনি, ক্ষমতায় যায়নি। এর মধ্যে তাদের নিয়ে সমালোচনামুখর রাজনীতিকদের একটি অংশ। সাদামাটা ভাষায় রাজনীতিবিদদের ড. ইউনূস বলেছেন, আপনারা যা কিছু বলবেন বা লিখিত দেবেন সব ওয়েবসাইটে দেয়া হবে। সংস্কার বাধ্যতামূলক নয় মন্তব্য করে তিনি আরো বলেছেন, কেউ সংস্কার না চাইলেও চার্টারে তা লিখে সাইন করতে হবে। জনগণ তা দেখবে এবং বিচার করবে।
ড. ইউনূসের এ ভাষার মাঝে সূক্ষ্ম রাজনীতি দেখছেন ঝানু রাজনীতিকরা। এটি প্রায় পরিষ্কার যে, শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত প্রশাসনের ওপর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ আনছেন ড. ইউনুস। সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে যা অপরিহার্য। যার সূচনা হয়েছে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের মাধ্যমে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জনসেবা, জনদুর্ভোগ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, আইনকানুন ও বিধিমালা সংশোধন এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্প্রতি শেষ হলো ডিসি সম্মেলন। সেখানেও আগে স্থানীয় নির্বাচনের তাগিদ এসেছে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com