প্রতিদিন যখন উত্তরা থেকে মিরপুর ও মিরপুর থেকে উত্তরা আসা-যাওয়া করি, তখন মনে হয় আজ বুঝি দুর্ঘটনার মুখোমুখি হবো। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় এই রুটে এমন বিপদে এখনো পড়িনি। ২০১৬ সালের শেষ দিকের কথা। ফার্মগেট থেকে উত্তরা আসার পথে জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় বাসের অন্যায় প্রতিযোগিতার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। চোখের পানি, আর হাত-পা-মুখের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরেছিল অঝোরে। অবাক হয়েছি, পথচারীরা শুধু তাকিয়েই ছিল। রাজধানীতে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনের পত্রপত্রিকায় চোখ মেললে এর সত্যতা মিলবে।
এ দেশে পরিবহন খাতে চলছে চরম অরাজকতা। নানারকম প্রতারণাও চলছে। প্রতিদিন যাতায়াতে ‘কম স্টপেজ’ বা ‘সিটিং সার্ভিস’ লেখা দেখে গাড়িতে উঠি, তারপরও ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়। পরিবহন কর্তৃপক্ষ থাকলেও তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চালকের তো কোনো জবাবদিহিতা নেই। মালিক বরাবর অভিযোগ করলে ‘ব্যবস্থা গ্রহণ করব’ বলেই থেমে যায়। তাদের স্বভাবধর্ম তারা পালন করে। কিন্তু দেশের প্রশাসনই বা কী করছে? নামমাত্র মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করেই দায় সারিয়ে ক্ষান্ত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। আর ট্রাফিক পুলিশের প্রকাশ্যে হাত পেতে টাকা নেয়াই বলে দেয় পরিবহন খাতে অনিয়ম অরাজকতা বন্ধ না হওয়ার একমাত্র কারণ এ দুর্নীতিই বোধ হয়। এ নিয়ে আমরা সাধারণ যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশজুড়ে এমন অরাজকতা মাত্রা ছাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে কী ঘটবে, ভেবে শিউরে উঠতে হয়। প্রতিদিন যাত্রী আর কন্ডাক্টর-চালকের সাথে কথা কাটাকাটি, কিলঘুষি, হাতাহাতি থেমে নেই। এসব দেখতে দেখতে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। আইন লঙ্ঘন করে তারা স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের গাড়িতে তোলা থেকে বিরত থাকে। অনেক বলা-কওয়ার পর তুললেও পুরো রুটের ভাড়াই আদায় করে নেয়। শিক্ষার্থীদের হাফ পাস দেয় না। প্রতিবন্ধীদের আসন অনেক ক্ষেত্রে দেয় না, পুরো ভাড়া চেয়ে বসে কিংবা ‘প্রমাণ’ দাবি করে। রাজধানীতে অর্ধশতাধিক পরিবহন নিজেদের ইচ্ছেমতো সিটিং সার্ভিস বানিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায় এবং দাঁড়ানো যাত্রী বহন করছে। এ সবের কোনো ধরনের বৈধতা নেই। এরা টিকিট দিতেও অপারগ। ফিটনেসবিহীন গাড়িতে রাস্তা ভরপুর। গাড়িতে গাড়িতে ইচ্ছা করে ধাক্কা লাগানো, অহেতুক হাইড্রোলিক ব্রেক চেপে, স্পিডব্রেকের ওপরও সমান বেগে গাড়ি চালিয়ে যাত্রীদের আতঙ্কিত করে তোলে। যত্রতত্র হর্ন বাজিয়ে শব্দদূষণ ঘটানো হয়। অনেক চালক আবার চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে অনবরত কথা বলে, গান শোনে, দেদারছে ধূমপান করে। সিটিং সার্ভিসে চেকিংয়ের জন্য একবার থামায়, আবার যাত্রী তোলার জন্য বারবার থামায়। ব্যবস্থাপনার কবলে পরিবহনের পরিস্থিতি প্রতিদিনই খারাপ হচ্ছে। কয়েক দিন আগে ঘটেছিল যুবক রাজীব হোসেনের ক্ষেত্রে কী ট্র্যাজেডি। মহাখালী এলাকার তিতুমীর কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব যাত্রাবাড়ী থেকে দুপুরে বিআরটিসি বাসে উঠেছিলেন কলেজে আসার জন্য। কিন্তু রাজধানীর একটি অন্যতম প্রধান পয়েন্ট, সার্ক ফোয়ারার কাছে স্বজন পরিবহনের একটি বাস দ্রুতগতিতে এসে বিআরটিসি বাসের গা ঘেঁষে এগোতে থাকে। রাজীব বাসের ভেতরে জায়গা না পেয়ে দরজায় ঝুলে যাচ্ছিলেন। তখন বাস দু’টির রেষারেষিতে তার ডান হাত শরীর থেকে মর্মান্তিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুই বাসের মাঝখানে ঝুলতে থাকে। খবরে এসব যখন পড়ছিলাম, তখন শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। এভাবেই দেশে রাজীবের মতো কতজন যে হাত, পা, এমন কি মূল্যবান জীবন হারাচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব হয়তো নেই। আমরা প্রায়ই দেখি, মাদকাসক্ত ও শিশু চালকরা গাড়ি চালাচ্ছে। অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজ বন্ধ করতে হবে। প্রশিক্ষণ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে দেয়া যাবে না। এ বিষয়টি পরিবহন মালিকরা কোনো দিনই আমলে নেন না। সরকারকে এ ব্যাপারেও এগিয়ে আসতে হবে।হ
লেখক : সম্পাদক, কাঁচাগোল্লা ম্যাগাজিন, ঢাকা
প্রতিদিন যখন উত্তরা থেকে মিরপুর ও মিরপুর থেকে উত্তরা আসা-যাওয়া করি, তখন মনে হয় আজ বুঝি দুর্ঘটনার মুখোমুখি হবো। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় এই...
