অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশে অবৈধ উপায়ে টাকা উপার্জনকারী অনেকে এখন দেশে টাকার রাখার চেয়ে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশী ব্যাংকে টাকা জমা রাখাকে নিরাপদ বা শ্রেয় মনে করছেন। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত হিসাবে দেখা যায়, সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশী নাগরিকদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ এক বছরেই ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৪ সালে সে দেশে বাংলাদেশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৫০৮ মিলিয়ন সুই ফ্রা, যা টাকার অঙ্কে প্রায় চার হাজার ৪০০ কোটি টাকা। নিজেও সুইজারল্যান্ড সফর করে বিষয়টি জেনে হতবাক!
উল্লেখ্য, দেশ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে। দেখার যেন কেউ নেই। যারা আছেন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে পাচারকারীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করছেন। টিআইবি ও দুদক বলেছে দুর্নীতি এতই বেড়েছে যে, সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান আজ টাকার কাছে পরাজিত। নানা দেশে বাংলাদেশী নাগরিকদের টাকা পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকেরা ভাবছেন, এর কারণ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ না থাকা। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশীদের টাকার পরিমাণ অনেক বেড়েছে। তা ছাড়া সেকেন্ড হোমের নামে মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে এখান থেকে।
উল্লেখ্য, ভারত সরকার সে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এখন সে দেশ থেকে অর্থ পাচার গত এক বছরে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে। অথচ বাংলাদেশে দিন দিন অর্থ পাচার অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে চলেছে। দেশে যখন বিদেশী বিনিয়োগের মন্দা, কর্মসংস্থান বাড়ছে না, বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে প্রতিদিন শত শত বেকার তরুণ ও নারী জীবন বাজি রেখে অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অনেকে মানব পাচারকারীদের ফাঁদে পা দিয়ে জীবন বিপন্ন করে তুলেছেন, তখন হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দেয়ার এই প্রতিযোগিতা বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক। এতে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকারের উদাসীনতা এবং ব্যর্থতা এ ক্ষেত্রে প্রমাণিত হচ্ছে।
আমাদের মতো গরিব দেশ থেকে অর্থ পাচার আগেও ছিল, তবে এত প্রকট ছিল না। টাকা ও মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশÑ কোনো ক্ষেত্রেই সরকারি সংস্থাগুলোর কেনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক আর সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতায় দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতা এবং গ্রাহকের গোপনীয়তা বজায় রাখার সুনামের কারণেই সারা বিশ্ব থেকে লোকজন সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখতে স্বাছন্দ্যবোধ করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোয় গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। দুর্নীতিবাজ এক শ্রেণীর ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে পাচার হয়ে যায়। এতে গ্রাহকেরা ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরাপদ মনে করে না বিধায় পাচারের বিকল্প চিন্তা করে থাকেন অনেকেই।
সেনাসমর্থিত সামরিক বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও কার্যক্রম শুরু হলে তখন টাকা পাচার অনেকটা কমেছিল। পরে নির্বাচিত সরকারের সময় থেকে বিদেশে এই পাচারের প্রবণতা অনেকগুণ বেড়েছে, যা খুবই রহস্যজনক। এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, এমপি, ব্যবসায়ী এবং সরকারি দলের ছত্রছায়ায় একটি চক্র অন্যায়ভাবে রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে। এসব কালো টাকা তারা বিদেশে পাচারকে নিরাপদ মনে করছে। এতে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। অবৈধ বা কালো টাকা দেশে ব্যবহারের সুযোগ না পেলে এই টাকা পাচার হওয়াই স্বাভাবিক। কারা শত শত কোটি টাকা পাচার করছে তাদের শনাক্ত করা তেমন কঠিন নয়। এ ক্ষেত্রে টাকার উৎস নির্ণয় করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের বিমানবন্দর ও ল্যান্ড পোর্টগুলোয় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বা মালামাল ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সর্বোপরি, দেশে আইনের শাসন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের জানমালের এবং ব্যবসায়ীদের বৈধ ব্যবসায় ও বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে অবিলম্বে। তা হলে টাকার পাচার বন্ধ হবে বলে আশা করা যায়। সুইস ব্যাংক থেকে বাংলাদেশীদের পাচারকৃত হাজার হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে ফেরত আনার স্বার্থে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জঙ্গি হামলা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনো গতি পাচ্ছে না। শেয়ার বাজারের বেহাল দশা। ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, গুম, খুন, ছিনতাই, নারী নির্যাতন, দখলবাজি, লুণ্ঠন, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা ও অনাস্থার মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতি অগ্রসর হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীরা দেশে টাকা রাখতে বা বিনিয়োগ করতে ভয় পাবেন। এনবিআর বাজেটে কালো টাকার ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্থের নিশ্চয়তা না থাকার কারণে মানুষকে টাকা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে দেখা যায়।
যা হোক, কারা সুইস ব্যাংকে টাকা রাখছে সরকার বা দুদক তাদের শনাক্ত করে তা ফেরত আনার এবং আপাতত কালো টাকা সাদা করার মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধ করার চেষ্টা করবে এ আশাই করছি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশে অবৈধ উপায়ে টাকা উপার্জনকারী অনেকে এখন দেশে টাকার রাখার চেয়ে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশী ব্যাংকে টাকা জমা...
