বর্তমান বিশ্বে একটি সভ্যতারই একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলছে। আধুনিক ইউরোপ থেকে উদগত এ সভ্যতা বিগত তিন-চার শ’ বছরে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। সমকালীন পৃথিবীর রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই এ সভ্যতার দর্শনের ভিত্তিতে চলছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার করালগ্রাসে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রায় সব ধর্মানুসারী মানুষেরই নিত্যদিনকার যাপিত জীবনব্যবস্থা বদলে দিয়ে অনেকাংশে এর মূল রূপ আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
এ সভ্যতার প্রধান দু’টি উপকরণ হচ্ছে বস্তুবাদ ও ভোগবাদ। মানুষের ইন্দ্রিয়ের নাগালের বাইরে যা কিছু, এর স্বীকৃতি এখানে নিরঙ্কুশ উপেক্ষিত। অথচ মানুষের ইন্দ্রিয় ক্ষমতা মরীচিকার চোরাবালিতে আবদ্ধ। অ্যাঞ্জেলস তাই বলেছেন, ‘জড় পদার্থ’ বা ‘বস্তুই’ হলো স্বীকৃত সত্য। বিবেক যা মানুষের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান নয়, ইন্দ্রিয়ও যার নাগাল পায় না, সেখানে প্রবৃত্তির দাসত্বই এদের অবাধ, ছন্নছাড়া ও লাগামহীন জীবনের পুতিগন্ধময় কেদাক্ত ভাগাড়ে নিক্ষেপ করেছে। সেই সাথে অতিন্দ্রিয় যে বিষয়টি যোগ হয়েছে, সেটি হচ্ছে সংশয়বাদ বা দ্বন্দ্ববাদ তথা ডায়ালেক্টিজম। আর এই সংশয় হচ্ছে জীবন ও জগতের সৃষ্টি পরিচালনা ও বিনাশ সম্পর্কে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পেরে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে সাধনা ও গবেষণার মাধ্যমে জীবন চলার পথ বাছাই করবে। ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ঈমান ও ইয়াকিন, ঠিক তার বিপরীত বিষয়টি।
খ্রিষ্টধর্মের বিকৃত রূপ থেকেই এ সংশয়ের জন্ম। সংশয় বুকে পুষে এ সভ্যতা কয়েক শ’ বছর পথ অতিক্রম করেছে। গির্জার অত্যন্ত প্রভাবশালী মূর্খ যাজকদের ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে কঠোর ও নিষ্ঠুর শাসনের নিষ্পেষণ থেকে আলোকিত জীবনে পদার্পণ করতে চতুর্দশ শতাব্দী থেকে ইউরোপীয় রেনেসাঁর স্রোত চলতে থাকে। এ সময় তারা সমাজ সংস্কারে ব্রতী হয়। কর্ডোভা, গ্রানাডা, সিসিলি, আন্দালুসিয়া, সেভিল কিংবা বাগদাদের মতো বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত খ্রিষ্টান ইউরোপীয় ছাত্রদের মনোজগতে এ উপলব্ধি বদ্ধমূলভাবে প্রোথিত হয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এ ধর্মের প্রয়োগ ও ব্যবহার একেবারেই অসার ও বিপজ্জনক। কারণ, যাজকেরা তাদের বোধ-বিশ্বাসবিরোধী জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো কথাই শুনতে ও বিরুদ্ধ মতবাদ সহ্য করতে প্রস্তুত ছিল না। এসব ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর নির্মমতা ও কঠোরতার নীতি তারা অবলম্বন করত; যার নেপথ্যে প্রধানত দোহাই হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল ধর্ম। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, ইউরোপ ইনকুইজিশন কোর্ট নামে বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে গির্জা ও তার যাজকেরা কী পরিমাণ নৃশংসতায় মেতে উঠেছিল। পুরো পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর বেশ কিছু দশকজুড়ে অব্যাহত ছিল তাদের এই ধর্মভিত্তিক দুর্বৃত্তপনা। গির্জার নৃশংসতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত গণমানুষের ক্ষোভ জমতে থাকে। গির্জা তার শাসনক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত নয়; অন্য দিকে জ্ঞানীগুণী, শিক্ষিত শ্রেণী ও সমাজ সচেতন এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও গির্জার অশিক্ষিত মূর্খ যাজক শ্রেণীর হাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়, কারণ গির্জার যাজকেরা যেসব অদ্ভুত তত্ত্ব-তথ্য ধর্মের নামে, ধর্মের বিধান বলে চালিয়ে আসছিল, সেসব তত্ত্ব-তথ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক তা এখন আর গোপন নেই; বরং প্রতিদিনই গির্জার অজ্ঞানতা মানুষের কাছে উন্মোচিত হচ্ছে। বিপুল জনসমর্থিত ইউরোপীয় রেনেসাঁর অপ্রতিরোধ্য ঢলের প্রাবল্যে যাজকেরা যখন প্রায় একঘরে, এমন সময় শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্য থেকে সুচতুর কিছু ব্যক্তি মার্টিন লুথারের (১৪৮৩-১৫৪৬) নেতৃত্বে এ দ্বন্দ্ব অবসানে এগিয়ে এলেন। তারা একটি আপসের মাধ্যমে সাব্যস্ত করলেন, ধর্ম শুধু ব্যক্তির জীবনেই এর কতক মৌলনীতি চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
পাদ্রি-যাজকের লাগাম টেনে আনা হলো গির্জা পর্যন্ত। দুর্ভাগ্যবশত, আজকের দিনে মুসলিম সমাজে এমন একটি প্রবাদ প্রচলিত আছেÑ ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’। চার্চের হাতে রাষ্ট্র ও সমাজের যত প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে, তা এখন থেকে থাকবে রাষ্ট্রের হাতে আর রাষ্ট্রের কর্ণধারের শপথ নেবেন চার্চের কাছে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের প্রায়োগিক নাগপাশের ছোবল থেকে প্রথমবারের মতো যুক্ত হলো মানুষের জীবন। মুক্তবিহঙ্গের মতো মানুষ মুক্তচিত্তে সাধনা ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করল পুরোদমে। বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজতত্ত্ববিদ কিংবা অর্থনীতিবিদদের গবেষণা ও সাধনার প্রায়োগিক রসায়নের ভিত্তিতে রচিত হলো আধুনিক ইউরোপীয় সমাজ। সেকুলার মতবাদের আওতায় তাদের লেনদেন, চলাফেরা, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষাদীক্ষা, বিচার-আচার তথা বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র পরিচালিত হতে লাগল। আর ধর্ম দূরীভূত হলো শুধু রেনেসিস্টদের দিয়ে নয়, যাজকদের ভ্রান্ত কর্মপ্রবাহের যোগান্তের মধ্য দিয়ে। অতএব, এ সত্য আজ অবলীলায় বলতে হয়, একটি সময়ের অনিবার্য দাবি মেটাতে বস্তুবাদ ও দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেরই গর্ভজাত ফসল। আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং এর থেকে উৎসারিত বস্তুবাদ ও সংশয়বাদ কিংবা দ্বন্দ্ববাদÑ এ তিনটি মতাদর্শের সমন্বয়ে রচিত একটি ধর্ম ও জীবনব্যবস্থা।

দুই.
সর্বশেষ ক্রুসেড শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করার পর তদানীন্তন ইউরোপীয় সমাজে এক প্রচণ্ড প্রতিশোধস্পৃহার সৃষ্টি হয়। আগেই উল্লেখ করেছি, ইতোমধ্যে তারা তৎকালীন সময়ে মুসলমানদের পরিচালিত বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠগুলোয় জাগতিক জ্ঞানে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অন্য দিকে মুসলমানেরা হাজার বছরেরও বেশি সময় বিশ্ব শাসনের পর তাদের মধ্যে আলস্য ও ভোগবাদিতা পেয়ে বসেছে। আত্মকলহ ও আত্মঘাতী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মতো আত্মপ্রবঞ্চনায় বড় হয়ে রাজ্য পরিচালনায় তাদের নৈতিক শক্তি ও ভিত্তি দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে নড়বড়ে। মুসলমানদের এ পৃথিবীতে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার রক্ষাকবচ পবিত্র কুরআনুল কারিমের গবেষণা ও অধ্যয়ন এবং সার্বিক জ্ঞানচর্চায় তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে প্রবল অনীহা। তৎকালীন বিশ্বের মুসলমানদের জাতীয় জীবন যখন অনেকটাই ঘোর অমানিশায় তিমিরাচ্ছন্ন, ঠিক সেই ফোকরটির অন্বেষণ করে আসছিল বহুকাল ধরে পশ্চিমের খ্রিষ্ট সমাজ; এমন একটি সময় কাজে লাগানোর স্বর্ণালী সুযোগ গ্রহণ করল তারা ষোলআনাই। শীতার্ত ইউরোপ মহাদেশের তুলনায় মুসলিম জন-অধ্যুষিত এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বরাবরই খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ছিল এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এক দিকে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা ও রাজ্য বিস্তার এবং অন্য দিকে মুসলিম দেশগুলোর ধনভাণ্ডারের হাতছানিতে উন্মত্ত পশ্চিমের খ্রিষ্ট সমাজ তাদের ছলচাতুরী ধুরন্ধরী বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে বণিক বেশে পদার্পণ করল ভারতীয় উপমহাদেশে। এমনিভাবে অন্তরের মূল দুরভিসন্ধিকে চেপে রেখে ডাচরা পাড়ি জমাল দূরপ্রাচ্যের দেশ ইন্দোনেশিয়া, স্পেন ও ফিলিপাইনে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার অনেক দেশ করতল করল ব্রিটিশ ও ফরাসিরা। পূর্ব আফ্রিকার দেশ লিবিয়া দখল করল ইতালি। এসব দেশের কোথাও বণিক বেশে, কোথাও চিকিৎসার নামে আবার কোথাও নানা ধরনের মিশনারি সেবাদানের চটকদার বুলি আওড়িয়ে এরা অনুপ্রবেশে সক্ষম হলো। দেশভেদে কোথাও প্রায় দুই শ’, কোথাও দেড় শ’ আবার কোথাও প্রায় শত বছর তাদের শাসনকাল স্থায়ী হলো। তাদের অধিকৃত দেশগুলোর বেশির ভাগই ছিল যেহেতু মুসলিম, তাই তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, তাহজিব-তামাদ্দুন, প্রশাসন, অর্থনীতি ও বিচারকার্য পরিচালনার মানদণ্ড ছিল কুরআন-সুন্নাহ, ইসলামি শরিয়া মোতাবেক। কিন্তু অনুপ্রবেশের অল্পকালের মধ্যে শাসকগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জন্য রবিঠাকুরের ভাষায়Ñ ‘গণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্য বিধাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হলো।
প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে উরারহব মঁরফবহপব বিদূরিত হলো এবং সেই স্থলে পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা নব্য জীবনবিধানের ভিত্তিতে এসব দেশের মানুষের জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালিত হতে লাগল। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মুসলমান যারাই এর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, রাজন্যবর্গ তাদের প্রতি যাজকদের মতো পৈশাচিক দমননীতি অবলম্বন করল। দীর্ঘ শাসনের গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হয়ে মুসলমানদের অনেকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে, অনেকে শাসককুলের সুবিধাভোগী হয়ে আবার অনেকে দ্বীন ইসলামকে সঠিকভাবে অনুধাবনের অনিচ্ছা কিংবা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে এক আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাহীন আত্মবিস্মৃত ভাগ্যহত জাতিতে পরিণত হলো। বিশ্বময় মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে দমিয়ে তাদের প্রণীত জীবনব্যবস্থার প্রতি মুসলমানদের আনুগত্য সৃষ্টি করতে এ জিনিসটিই চাচ্ছিল তৎকালীন পশ্চিমা রাজন্যবর্গ। উল্লেখ্য, তাদের এই মানসিকতা আজ পর্যন্ত অনুরূপ আছে। ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সেক্রেটারি অব কলোনিজ জর্জ গ্ল্যাডস্টোন প্রদত্ত এক ভাষণে এক জিলদ কুরআন শরিফ হাত উঁচিয়ে বলেন যে, ‘যত দিন মুসলমানদের মধ্যে এই কুরআন শরিফ থাকবে আমরা তাদের বশ করতে পারব না। হয় তাদের কাছ থেকে এটি আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে অথবা তারা যেন এর প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে আমাদের, তাদের প্রতি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
দুঃখজনক সত্য, তাদের সেই আকাক্সা ও সাধনা দূরপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে সর্বপশ্চিমের মুসলিম নিবাস আলজেরিয়া, মরক্কো পর্যন্ত অনেকাংশেই বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব দেশে মুসলমানদের মধ্য থেকে এমন অনেক শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রশাসকের আবির্ভাব হয়, যাদের অবস্থা সত্যিকার অর্থেই হয়ে ওঠে এমনÑ More catholic then Pope । সত্যিকার ইসলামের কথা যিনি বলেছেন, তিনি স্বজাতি শাসকের হাতে এমন অবর্ণনীয় ও অমানবিক নির্যাতন এবং কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, যা ইতঃপূর্বে তাদের আদর্শিক প্রভুরাও এতটা করেনি।

তিন.
শান্তির প্রত্যাশায় বিশ্ব আজ দিশেহারা। দু-দু’টি বিশ্বযুদ্ধ এবং সোভিয়েত রাশিয়া ভাঙনের পর একক পরাশক্তির ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত টলে গেলেও একক পরাশক্তির দর্প-জুলুমের আরেক পাহাড় তৈরির উন্মত্ত প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। মোট কথা, এ সভ্যতা মানুষকে দুদণ্ড শান্তিতে বসবাস করতে দেয়নি। ইতঃপূর্বে ভোগবাদ ও পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে সৃষ্ট কমিউনিজম বিশ্বের সরলপ্রাণ ও শান্তিপ্রত্যাশী মানুষকে গত শতাব্দীর প্রায় ৭৫ বছর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে ছেড়েছে। পাশ্চাত্য সভ্যতা শক্তি অর্জনের আগে সমগ্র বিশ্ব ইসলামি সভ্যতার ছায়ায় প্রায় হাজার বছর পথ অতিক্রম করেছে। হাজার বছরেও পৃথিবীতে সঙ্কটের এত বড় আবর্ত সৃষ্টি হয়নি। তা ছাড়া বস্তুগত উন্নতির দিকনির্দেশনাও ইসলাম দিয়েছিল। তার ফলে বস্তুগত উন্নতির যে বুনিয়াদ সৃষ্টি করেছিল, তারই ভিত্তিতে আধুনিক সভ্যতা এতটা পথ অতিক্রম করতে পেরেছে। ইসলামের আওতায় সভ্যতার এ বিধ্বংসী রূপ ও মারণাস্ত্রের বাহার ছিল না।
তাই ইসলামই আধুনিক সভ্যতার উত্তরাধিকারী। মৃত্যু অবধারিত হলেও মৃত্যুর জন্যই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। আর এ জন্য বেঁচে থাকার মেয়াদ যত স্বল্পই হোক না কেন, তার সার্থকতাই মৃত্যুকে সার্থক করে তোলে। এজন্যই ইসলাম বস্তুবাদী উন্নতির জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং ইসলামের ঈমান ও ইয়াকিনের মধ্যে বস্তুবাদী উন্নতিকে মানবিক কল্যাণমুখী করার মন্ত্র নিহিত আছে। তাই ইসলামের অনুসারী পৃথিবীও এগিয়ে চলে। তুরস্কে ১৯২৩ সাল থেকে ৭২ বছর কঠোরভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের চেতনায় জনগণকে গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের অন্তর থেকে ঈমানের অগ্নিকণা নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
ড. নাজিম উদ্দিন আরবাকান সে অগ্নিকণাকে অগ্নিশিখায় রূপান্তরিত করেছেন। রজব তাইয়েব এরদোগানের মতো একজন জ্ঞানী, সৎ, যোগ্য, সাহসী ও ধার্মিক ব্যক্তি আজ দু-দু’বারের গণরায়ে সে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। আশা করা যায়, তিনিই হবেন মুসলিম বিশ্বের সর্বপ্রধান নেতা। তিনি মুসলিম উম্মাহর আশা পূরণে ভূমিকা পালন করবেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার জনগণ ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের মতো একজন ইসলামি সভ্যতার কর্ণধার এবং আধুনিক মালয়েশিয়ার অর্থনীতির বুনিয়াদ সৃষ্টিকারী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বহু গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিত্বের পক্ষে তাদের গণরায় দিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ন-সুহার্ত গংদের মতো কঠোর সেকুলারদের শাসনের পর আজ সেখানে ৫০টিরও বেশি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরিবর্তিত সভ্যতার এ হওয়া আজ সুদূর আফ্রিকার মিসর, তিউনিসিয়া ও মরক্কো পর্যন্ত দোলায়িত করছে। ১৯৯২ সালে আলজেরিয়ায় ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট ৮০ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়েছিল। তারপরও তাদের এই গণরায়কে চাপিয়ে রাখা হয়। সত্যের ধর্ম হলো একদিন তা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মিথ্যা ঢাকা পড়ে। নজরুলের ভাষায়Ñ ‘বাজেরে দামামা বাঁধরে আমামা/শির উঁচু করি মুসলমান এসেছে দাওয়াত নয়া জামানার/ভাঙা কেল্লায় উড়ে নিশান।’ কয়েক শ’ বছরের নিগ্রহের যাঁতাকলে পিষ্ট বিশ্বসমাজ আজ এ সত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছে যে শত আঁধারের পর্দা পেরিয়ে রাঙা প্রভাত একদিন আসবেই। নারঙ্গী বনে সবুজ পাতা কাঁপতে কাঁপতেই নতুন দিনের সূচনা হবে। হ