নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকেরা। কোনো সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হলে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায়; কিন্তু যখন কারো কাছে ন্যায়বিচার না পান, তখন সাংবাদিকদের সেটা জানান। সাংবাদিকেরা তাদের কলমের মাধ্যমে নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরে ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যবস্থার চেষ্টা করেন। দুর্নীতি ও অপকর্মের চিত্র তুলে ধরে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিরলস পরিশ্রম করে যান, কিন্তু বিনিময়ে কী পান? বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিকেরা কী পান? তাদের ভাগ্যে কী জোটে? কোনো কোনো সময় যে পত্রিকার জন্য তারা পরিশ্রম করে, সেই পত্রিকার কর্তৃপক্ষও তাদের পাশে থাকে না। তারা দুর্দিনে কাউকে কাছে পান না। হামলা-মামলা, নির্যাতন-নিপীড়ন তাদের নিত্যসঙ্গী। সব কিছু মাথায় রেখে তারা দেশ ও জাতি এবং সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যায়।
এখন প্রশ্ন হলোÑ সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী মারলে বা পেটালে অথবা হত্যা করলে কী হয়? তারা কি কখনো ন্যায়বিচার পান, তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা আছে? তাদের পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা আছে? রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা কখনো কি তাদের নিরাপত্তার জন্য কখনো কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন? রাষ্ট্রের সহায়ক হিসেবে তারা কাজ করে যান, অথচ তাদের স্বীকৃতি নেই। তাই সময় এসেছে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় আইন করা। সব সাংবাদিকের ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি তোলা উচিত, সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব উপস্থাপন করা। অন্যথায় কালে কালে, যুগে যুগে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা মার খেতে থাকবেন ও নির্যাতন এবং নিপীড়নের শিকার হবেন।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হলেন, কিন্তু আজো তার রহস্য উন্মোচন হলো না, রহস্যই রয়ে গেলে। তাদের হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশের সাংবাদিকেরা মানববন্ধন করলেন, প্রতিবাদ সভা করলেন, কিন্তু তা যেন রাষ্ট্র পরিচালকদের কানে গেল কি গেল না, তা অধরাই থেকে গেল। এখন সেই বিষয় নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামান না। কারণ, মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু তেলবাজ তো রাষ্ট্রযন্ত্রের গোলামি শুরু করেছেন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য।
আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর প্রকাশ্য আদালতের চত্বরে হামলা হলো, আর মামলার তো শেষই নেই। আরেক সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদের মাথায়ও রয়েছে মামলার বোঝা। তারা অবশ্য সাংবাদিকদের জাতীয় পর্যায়ের নেতা। তাদের ওপর হামলা হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আলাপ-আলোচনা হয়। কিন্তু যারা মফস্বলের সাধারণ সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীÑ তাদের ওপর যখন হামলা হয়, মিথ্যা মামলা হয়; তখন প্রতিবাদ করার মতো কেউ থাকে না। প্রতিনিয়ত কোথাও- না- কোথাও সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা নির্যাতন এবং নিপীড়নের শিকার হন। হুমকি-ধমকির শিকার হন, মিথ্যা মামলার শিকার হন। কোনো দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলেই জুড়ে দেয় চাঁদাবাজির মামলা। পুলিশ অভিযোগের সত্যতা যাচাই-বাছাই না করেই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে টেনে টেনে জেলহাজতে নিয়ে যায়। কখনো বিচার-বিশ্লেষণ করে না; যারা এই পুলিশদের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করেÑ তাদের কিভাবে হাতকড়া পরিয়ে টেনে নিয়ে যায়। বিবেক বলতে কিছুই কি নেই?
হ্যাঁ! কিছু সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নামধারী রয়েছে, যারা চাঁদাবাজি করে থাকেÑ সেটা অবশ্য ব্যতিক্রম। প্রত্যেক পেশায় কিছু না কিছু দুষ্কৃতকারী থাকে। যারা সংশ্লিষ্ট পেশাকে কলুষিত করে। আমার উপজেলায়ও কিছু সাংবাদিক রয়েছে। যারা ফেরিওয়ালদের মতো। লাজলজ্জা বলতে কিছুই নেই। ইজ্জত-সম্মান মনে হয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন। এদের কথা বলে লাভ নেই। এরা যুগে যুগে মীরজাফরের ভূমিকায় ছিলেন এবং আগামীতেও থাকবেন। তাদের কাছে নিয়ম-নীতি বলতে কিছুই নেই। আমার জানা মতে, কোনো এক সাংবাদিককে সংশ্লিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যান তার কর্মীবাহিনী দিয়ে আচ্ছামতো মারধর করেন। আমরা তার ওপর হামলার বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু করি। কিন্তু ওই বেহায়া রাতের আঁধারে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে আপস করে। এই হলো সাংবাদিক নামধারী কিছু কীটপতঙ্গের দল।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা হামলার শিকার হন। কিন্তু পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। যদিও হামলাকারীদের ছবি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। এই কার্যক্রম থেকে বোঝা যায়Ñ সাংবাদিক মারলে কী হয়? কিছুই হয় না। বরং বিভিন্ন সময় দেখা যায়, সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নিপীড়নকারীদের পুরস্কৃত করা হয়। তাই সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নির্যাতন বন্ধ হয় না। ক্ষমতার দাপটের কাছে নীতিবাক্য অসহায় হয়ে যায়। সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা জরুরি।হ
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বুড়িচং প্রেস কাব, কুমিল্লা
