বিবিসি একটি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানে রাজনীতি ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট নিয়ে যে আলোচনা হয় তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও হয় না। এ দেশের মানুষ অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন। এ দেশের রাজনীতি যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি অনিশ্চয়তায় ভরপুর। বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও গণতন্ত্র ও রাজনীতির দেহ-মন ভালো নেই। স্বৈরতন্ত্র নামক ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। বিরোধী দল ও মতের দমনপীড়ন, হামলা, গায়েবি মামলা, জেল-জুলুম, হত্যা-গুম, নির্যাতন এবং এর সাথে দৃশ্যত কিছু উন্নয়ন ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে প্রায় কেটে গেছেÑ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ‘৫ জানুয়ারির ৫ শতাংশ’ ভোটের পাঁচ বছরের সরকার। ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন। সেখানে সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোটের মাঠ পাহারা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। এটাকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘ষড়যন্ত্র ও গৃহযুদ্ধের আলামত’ বলে অভিহিত করেছেন। এই মন্তব্য কেন করলেন, এটা বোঝা কঠিন নয়। তিনি হয়তো বিরোধী পক্ষের ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাকে একটা বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন। বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন, সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহীতে তাদের জনসমাবেশকে জনসমুদ্রে পরিণত করে, বিপুল নেতাকর্মীর সমাগমে রেকর্ডসংখ্যক মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ একটা ঐতিহ্যবাহী ও মুক্তিযুদ্ধে বড় অবদান রাখা দল। ভোটারবিহীন, একপেশে, বিশ্ববাসীর কাছে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে এমন একটা দলের ক্ষমতায় টিকে থাকা মোটেও ভালো হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে; যা ক্ষমতা থেকে না গেলে তারা বুঝতে পারবে না। এটা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হয়ে থাকবে, যার চরম খেসারত দিতে হতে পারে নির্বাচনে। অপর দিকে, নানা সমস্যায় জর্জরিত বিএনপি গত ১২ বছর খেসারত দিতে দিতে এখন অনেক পরিণত। এর সুফল ইতোমধ্যে তারা পেতে শুরু করেছে। একটা সময় বিএনপি এতটা দুরবস্থায় পড়েছিল যে, দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে বক্তব্য বা স্টেটমেন্ট রেকর্ড করে প্রচার করতে হতো। বড় বড় নেতাকে লুকানো অবস্থায়ও গ্রেফতার হতে দেখা যেত। এমনটি এখন আর হচ্ছে না। নেতাকর্মীরা এখন রাজপথে বেশ সরব। বড় নেতাদের এখন রাজপথে আন্দোলনরত অবস্থায় গ্রেফতার হতে দেখি। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন বাড়তি উন্মাদনা। সবাই বুঝে গেছেন, মুক্তির একমাত্র পথ অহিংস আন্দোলন। তাদের ঠিকানা এখন রাজপথ হয়ে ভোটের মাঠ। নেত্রী বেগম জিয়ার মুক্তি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও শাসন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির একটা দারুণ সফলতা ও চমৎকার কৌশল। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে এ দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না।’ কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘খালেদা জিয়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তাকে ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কথা চিন্তা করা যায় না।’ মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘বেগম জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করে তাকে নিয়ে আমরা নির্বাচনে যাবো।’ আ স ম আবদুর রব বললেন, ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে তাকে মুক্তি দিতে হবে।’ আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, ‘মুক্ত খালেদা জিয়ার চেয়ে বন্দী খালেদা জিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী।’ হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জেল জীবনের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের হিসাব নেয়া হবে।’
ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বেশির ভাগ একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ‘ঘরের মানুষের পক্ষ থেকে’ এমন কথা নিশ্চয়ই তাদের ভালো লাগার কথা নয়। এমনকি এটা তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয়ে শঙ্কিত করে তোলে।
গোলাম মাওলা রনির বিএনপিতে সদ্য যোগদান আগামী নির্বাচনের জন্য তাৎপর্যবহ। এ পর্যন্ত সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়ার ছেলে অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ যেসব বড় নেতা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগদান করেছে বেশির ভাগ গণফোরাম বা অন্য দলে ভিড়েছেন। তারা ভালো করে জানেন, বিএনপি অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্ট পুঁজি করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন ও উৎপাদনের দর্শনকে মনে-প্রাণে ধারণ করে বিকশিত হয়েছে। তাদের ধারণা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগদান করলে তাদের গায়ে একটা ‘গন্ধ লাগতে পারে’। এ জন্য তারা গণফোরাম বা অন্য দলে যোগদান করে বিএনপির ভোট নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাচ্ছেন। এতে বিএনপির জন্য আপাত ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। এ ক্ষেত্রে রনি সরাসরি বিএনপিতে যোগদান করেছেন দীর্ঘমেয়াদি সুফলের আশায়। কারণ, তিনি ভালো করে জানেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট স্থায়ী কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়। বিএনপির মতো বড় একটি দলে যোগদান মানে, রাজনীতিতে শক্ত একটা ভিত্তি পেয়ে যাওয়া।
অনেকের ধারণা, বর্তমান সরকার যেনতেনভাবে একটা নির্বাচন করে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় চলে আসায় দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে, ততই যেনতেন নির্বাচন করার অভিপ্রায় কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ, যা হয়তো ক্ষমতাসীনেরা ইশতেহার ঘোষণার সূচনালগ্নে চিন্তা করেননি।
আন্তর্জাতিক মহলও গত ৫ জানুয়ারির মতো একপেশে নির্বাচন দেখতে চায় না। এবার বাংলাদেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণীয় নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ইউইসহ নানা সংস্থা ও দেশ। জাতিসঙ্ঘ অব্যাহতভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে। গতবার ভারতের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে দেশটি নানাভাবে সমালোচিত। তাদের একটা নির্দিষ্ট দল সমর্থন দান করার কারণে দেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে, যা বিশেষত অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য ক্ষতিকর। উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের বড় একটা বাজার। তারা বৃহৎ স্বার্থের বিষয়টি অগ্রাহ্য করে মনে হয় না এবারের নির্বাচনে একটা নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করবে। তাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও কূটনৈতিক দুর্বলতার কারণে নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারসহ কিছু দেশকে চীনের কাছে হারাতে হয়েছে। এসব দেশের বাজার ও প্রশাসন এখন চীনের প্রভাবাধীন বাংলাদেশের বাজার ও কূটনীতিতেও চীনের প্রভাব দৃশ্যমান। চীন এ দেশে বড় বড় প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ফেলেছে।
ক্ষমতাসীনেরা যদি আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন না পান এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি যদি মাঠ দখলে রাখতে পারে, একপেশে নির্বাচন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।
বিএনপি যদি মাঠ দখলে নিতে পারে এবং ভোটের আগের দিন থেকে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়িয়ে গণজোয়ার তৈরি করে; ভোটকেন্দ্রভিত্তিক পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে, তবে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী বাধা দিতে পারবে না। একটি ভোটকেন্দ্রে পাঁচ-ছয়জন পুলিশসহ ১২-১৩ জন নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। হাজার হাজার মানুষের সামনে দিয়ে দৃশ্যত নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা কঠিন।
এ দিকে, বিএনপি গুরুতর অভিযোগ করেছে, গত ২০ নভেম্বর অফিসার্স ক্লাবে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ, র্যাব ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত, পুলিশের একজন ডিআইজি বলেন, পুলিশ সূত্রের খবর অনুযায়ী ৩৩টি সিট নৌকার কনফার্ম এবং ৬০-৬৫টিতে কনটেস্টড হবে, বাকি আর কোনো সম্ভাবনা নেই। সাংঘাতিক কিছু করা ছাড়া এটি উতরানো যাবে না। বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা শেষে মূল সিদ্ধান্ত হয়েছে, নির্বাচন কমিশন থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে চরম অসহযোগিতা করা হবে; যতই চাপ দেয়া হোক, প্রশাসনে হাত দেয়া যাবে না; ধরপাকড় বাড়ানো হবে; প্রার্থী গুম-খুন করে এমন চরম পরিস্থিতি তৈরি করা হবে যাতে বিরোধীরা নির্বাচন থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। বৈঠকে আরো বলা হয়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি শেষ পর্যন্ত ভোটে টিকে যায়, তাহলে ভোটের দিন পর্যন্ত ধরপাকড়ের তাণ্ডব চালানো হবে নির্দয়ভাবে, যেন ভোটকেন্দ্রে কেউ হাজির হতে সাহস না করেন। আর যদি ধানের শীষের অনুকূল ভোটের হাওয়া ঠেকানো না যায়, তবে মিডিয়া ক্যু করে নৌকাকে জেতাতে হবে; বিটিভির মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করে সব মিডিয়াতে তা রিলে করার ব্যবস্থা করা হবে। একবার ফল ঘোষণা করতে পারলে তারপর সব ‘ঠাণ্ডা করা’ যাবে।
এই অভিযোগ যদি সত্য কিংবা সত্যের কাছাকাছিও হয় তবে এ গোপন বৈঠক আওয়ামী লীগকে অনেক নেগেটিভ পয়েন্ট দেবে। বরং ঐক্যফ্রন্ট বেশ কিছু পজিটিভ পয়েন্ট পাবে। কারণ এটা জেনে বুদ্ধিজীবী ও জনসাধারণ আরো বেশি সোচ্চার হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য। তা ছাড়া এ ঘটনায় প্রশাসন ও পুলিশ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে নতুন করে ভাববে এবং গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করবে যা নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করবে।
কোনো দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে যতটা প্রভাব বিস্তার করা যায়, তা জাতীয় নির্বাচনে করা সম্ভব নয়। প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি ও পরিবারের কথা ভাবতে হয়। যদি তার নির্দিষ্ট একটা দলকে অনৈতিকভাবে সমর্থন বা ভোট কারচুপিতে সহায়তা করেন তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি নেমে আসতে পারে নানা বিপদ। তাই প্রশাসন, বিশেষ করে পুলিশে চাকরিরত লোক হাজারবার ভাববেন কী করা উচিত। অন্য দিকে, নিরপেক্ষ বা সত্যের পক্ষে থাকাটা যত সহজ, ভোটে কারচুপি করা বা অসত্যের পক্ষে থাকা ততটাই কঠিন। বিবেক হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত।
অভিজ্ঞতা বলে, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ যদি ভোটে অংশগ্রহণ করে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে বাধ্য। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, বিদেশী মহল এবং জনগণ নির্বাচন নিয়ে যতই উদ্বিগ্ন হোক না কেন, আশা করা যায় ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কম সহিংসতাপূর্ণ এবং হানাহানি ও কারচুপি ব্যতিরেকে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে। যারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে পরাজিত হলে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হবে। তাদের জ্ঞাতার্থে বলা যায়, এমন কিছু হবে না। বরং বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট জিতলে তাদের নীতিনির্ধারকেরা সহিংসতার কথা ভেবে বিজয় মিছিলের অনুমতি দেবেন কি না সন্দেহের অবকাশ আছে। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা, তাদের নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়াতে বলেছেন, বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে তাদের দলের পাঁচ লাখ লোক মারা যাবে। টাকা-পয়সা নিয়ে পালাতেও পারবেন না। রোহিঙ্গাতে পরিণত হতে হবে।
এমন কিছুই হবে না। তার পেছনে যুক্তি হলোÑ ১. স্বৈরাচারী এরশাদ ৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর যখন তাকে জেলে ঢোকানো হলো তখন বলা হয়েছিল, তার জাতীয় পার্টি টিকবে না। তিনি জেলে থেকে পাঁচ আসনে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। এখনো এরশাদ যেভাবেই হোক টিকে আছেন। এখনো তাকে জাতীয় নির্বাচনে একটি ‘বড় ফ্যাক্টর’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২. আমরা দেখেছি, গাড়ির চাপায় কলেজের দু’জন ছাত্র মারা যাওয়ার পর দেশ অচল হয়ে যায়। তা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝাঁকি বলে বিবেচনা করা হয়; কোনো রাজনৈতিক দল এমন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলতে পারেনি। এখন ভাবুন জনগণের বিপুল ম্যানডেট নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলো এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সহিংসতা করা হলে নিয়ন্ত্রণহীন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তা জয়ী দলের সরকার গঠনের জন্য শপথগ্রহণ অনিশ্চিত করে দেবে। ৩. জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে সহিংসতা হয়তো কিছুই হবে না। বরং গঠিত হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে যোগ্য ও মেধাবীদের নিয়ে নয়া পার্লামেন্ট; এটাকে কেউ যদি আগ বাড়িয়ে জাতীয় সরকার বলে তবে বিরোধিতা করার কোনো অবকাশ থাকবে না। মূল ক্ষমতা বিএনপির হাতে থাকলেও হাইব্রিড নেতাদের তেমন কিছু করা সম্ভব হবে না। ৪. বিএনপি যদি তাদের সবচেয়ে খারাপ দিন পেরিয়ে, দুর্দিন কাটিয়ে ধ্বংস স্তূপ থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, আওয়ামী লীগ তারাও ঘুরে দাঁড়াবে; এটা স্বাভাবিক বর্তমান সরকার বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন করার পরও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং ন্যায়বিচার ও সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় তাদের ব্যাপারে জনগণ নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। ৫. বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট যদি অসমাপ্ত বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প সুসম্পন্ন করে বা উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে নতুন নতুন জনবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করে, তাদের ক্ষমতা আরো পাকাপোক্ত হবে। আওয়ামী লীগের ওপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং স্থানীয় নির্বাচনে অনিয়মের কারণে যে কালিমা লেপন হয়েছে, তা কোনো দিন মুছবার নয়। তারা জোর করে যদি নির্বাচন না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নির্বাচন করত, তবে তারা হয়তো পরাজিত হতেন; কিন্তু এবারের নির্বাচনেই তাদের জয়ের সম্ভাবনা থাকত। দেশ পড়ত না স্বাধীনতা-উত্তর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সঙ্কটে। অন্য দিকে, বিএনপি মাগুরা ও রমনা-তেজগাঁও আসনে ‘কারচুপির উপনির্বাচন’ করার খোঁটা শুনছে এবং ‘ভুলের মাশুল’ দিচ্ছে।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব বা আত্মতুষ্টি লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা ভাবছেন, শেখ হাসিনা যেকোনোভাবে তাদের তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় নিয়ে আসবেন। সন্দেহ নেই, শেখ হাসিনা বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার আসনে এনেছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভুলে গেলে চলবে না, তাদের সভানেত্রীর একার পক্ষে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা দুরূহ। তারা যদি ভাবেন, তিনি যেকোনো উপায়ে তাদের ক্ষমতায় এনে দেবেন; এই ধারণা বা আত্মতুষ্টি আত্মঘাতী হতে পারে। এই একটি ভাবনাই তাদের ভরাডুবি ঘটাতে যথেষ্ট। তা ছাড়া ভোটের মাঠে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট তাদের যত বড় প্রতিপক্ষ, তার চেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তাদের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব।
৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন, একপেশে ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে পাঁচ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা আওয়ামী লীগে যেমন কালিমা লেপন করেছে, তেমনি গণতন্ত্রের পথচলাকে করা হয়েছে বিপন্ন। অবশ্য বিএনপি ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ঘাত-প্রতিঘাতে, জুলুম-নির্যাতন, হামলা-গায়েবি মামলায় পোড় খাওয়া খাঁটি দলে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়া ছাড়াও তিনি গণতন্ত্রের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা বাংলাদেশে বিরল। তিনি সরকারের সাথে আপস করলে আরাম-আয়েশে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি দেশ ও জনগণের কথা চিন্তা করে; অস্বচ্ছতার কাছে মাথা নত না করায় বৃদ্ধ বয়সে আজ কারাগারে বন্দী। গণতন্ত্র ও মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য কেউ যদি বাংলাদেশ থেকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত ও তার যোগ্য হন, সে নামটি হবে বেগম খালেদা জিয়া। আরেকজনের কথা না বললে তার প্রতি অবিচার হবে; তিনি হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন ও পথচলা বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সঙ্কটের সময়ে দলের হাল শক্ত করে ধরে রাখার কৃতিত্ব দিতে হবে তাকে। সংসদ নির্বাচন নিয়ে যতই দোলাচল থাকুক না কেন, দেশের জনগণ অধীর অপেক্ষায় দিন গুনছে দীর্ঘ দিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগ করার। নির্বাচনটি হোক অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, পেশিশক্তিমুক্ত, সব দলের অংশগ্রহণে। ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে জনবান্ধব একটি সরকার গঠিত হয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাক প্রিয় বাংলাদেশ। হ
লেখক : কবি ও গবেষক