দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে উন্নত করতে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
চলমান বেতন কাঠামো যা, তাতে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিলে কেউ আর হয়তো সন্তানকে ডাক্তারি পড়াবেন না। গ্রামে পাঁচ বছর ডাক্তারি করা স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণের শর্ত হলে, এ ক্ষেত্রেও অনেকেই ডাক্তারি পড়বে না। সবাই ইন্টার্নি শেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা গিয়ে ডাক্তারি করতে চাই। সেখানে সম্মান ছাড়াও আছে গবেষণার পরিবেশ। সেরা চিকিৎসক হওয়ার সুযোগও মেলে যেতে পারে।
ডাক্তারদের নিয়োগ জেলাভিত্তিক নয়, বরং আলাদা কমিশনের মাধ্যমে হতে হবে। কার্যকর ও সুষম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলা সদর হাসপাতাল এবং মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত কনসালট্যান্ট, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করতে হবে। পদবি না পাওয়ার কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে সংক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত অবস্থায় আছেন। ফলে জনগণও চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছে। ‘বেতনহীন ডাক্তারি’ বিলুপ্ত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য ডাক্তারকে কত বেতন দেয়া হয়, আর মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের ডাক্তার বানানোর জন্য একই চিকিৎসককে আলাদা কত বেতন দেয়া হয়, তা প্রকাশ করা উচিত। মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের ডাক্তার বানানোর জন্য, পাঁচ বছরে শিক্ষার্থীপ্রতি জনগণের ট্যাক্সের টাকার সর্বমোট কত খরচ হয়, সে হিসাব ব্যাখ্যাসহ বিস্তারিত প্রকাশ করা হোক। অন্যান্য খাতের শিক্ষার্থীদের সাথে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয়িত জনগণের ট্যাক্সের টাকার তুলনামূলক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন। ডাক্তারদের জন্য চাকরির প্রথম শ্রেণীতে পদোন্নতি ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের অমর্যাদা করে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির চিন্তা করা অবাস্তব। ইন্টার্নিশিপ দুই বছর করলে তার দ্বিতীয় বছর শেষে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট দিতে হবে।
অবিলম্বে, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন ছাড়াই চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে ডাক্তারদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে অন্যদের মতো। প্রমাণিত হওয়ার আগে চিকিৎসা ‘ভুল’ হয়েছে বলে কেউ প্রচার করলে এবং চিকিৎসককে মানসিক বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করলে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করাই কাম্য। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার ব্যাপারে কারো সন্দেহ হলে বরং ভুল চিকিৎসার ‘অভিযোগ’ করা যাবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে ভুল চিকিৎসা হিসেবে নয়।
উন্নত দেশের আদলে চিকিৎসাসেবার প্রাথমিক স্তরে রোগীপ্রতি ২০ মিনিট সময় চাইলে সেসব দেশের আদলে প্রতি ২৫০ জনগোষ্ঠীর জন্য একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে হবে আগে। সে ক্ষেত্রে, ডাক্তারের সংখ্যা বর্তমান সংখ্যার ৯ গুণ বাড়াতে হবে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে বহির্বিভাগে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আউটডোর মেডিক্যাল অফিসারের পদ সৃষ্টি করতে হবে।
পার্সেন্টেজ বা ওষুধ কোম্পানি থেকে অর্থ গ্রহণ অথবা দালালের সাথে সম্পর্ক থাকার অপরাধে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দালালদের জন্যও উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মিথ্যা পরিচয় বা মিথ্যা ডিগ্রি ব্যবহার করে যারা বিভিন্ন স্থানে চেম্বার স্থাপন করেন বা বিভিন্ন ক্লিনিকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চাকরি করেন, তাদের পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান করতে হবে। ফার্মেসি ব্যবসায়ী কর্তৃক ভিজিট ফি নেয়া বা টেস্ট করতে দেয়ার অপরাধে অনুরূপ শাস্তি দিতে হবে। তারা ভিজিট ফি নেয়ার অধিকার নেই। তারা টেস্ট করানোর জন্য কিভাবে বলেন? এমন অরাজকতা বহাল রেখে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। ফার্মেসি ব্যবসায়ী কর্তৃক রোগীকে তৃতীয় বা তদূর্ধ্ব প্রজন্মের জীবাণুবিরোধী ওষুধ দেয়া এবং একই সময়ে একাধিক ব্যথানাশক ওষুধ দেয়ার দায়ে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশের কোনো ডাক্তার বেআইনিভাবে এ দেশে কোথাও ডাক্তারি করলেও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ‘পল্লীচিকিৎসক’ শব্দটি বিলুপ্ত করতে হবে। এর পরিবর্তে ‘ফার্মেসি ব্যবসায়ী’ শব্দ ব্যবহার করা যায়। মনে রাখতে হবে, পেটে খেলে পিঠে সয়। কিন্তু কথাটা পিঠে খেলে পেটে সয়’ নয়। হ
লেখক : চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা