প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হাত আদালতের মতোই নাকি লম্বা ও মজবুত। শপথ অনুযায়ী তিনি অনুরাগ-বিরাগবর্জিত নিরপেক্ষ, সৎ, বিশ্বস্ত সত্যপরায়ণ এক আপসহীন ব্যক্তিত্বও বটে। সুতরাং তাকে বহু প্রত্যাশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্পও ভাবা যেতে পারে। এহেন নির্বাচন কমিশন যখন সহিংসতা মোকাবেলায় নিজেই বিব্রত, তখন তার পবিত্র ‘ব্রত’ পালনের সামর্থ্য ও মানসিক অবস্থা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। সম্ভবত এ জন্যই তিনি এখন অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবর্তে ‘অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন উপহার দেয়ার কথাই বারবার বলছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ব্যাপারে তার সংশয় প্রকাশের কারণও বোধ করি এখানেই। অবশ্য শেষাবধি কোনো দল নয়, বরং জনগণের প্রত্যাশার বিজয় নিশ্চিত করে একটা কলঙ্কমুক্ত নির্বাচন করার প্রত্যয় হঠাৎ করেই ঘোষণা করা হলো। এটি আঁধারে আশার আলো নাকি অন্য কিছু তা নিয়ে সন্দেহ না করে আস্থা ও বিশ্বাসটা ঝালাই করে আপাতত প্রশান্তি অনুভবে লাভ বৈ ক্ষতি আছে বলে মনে করি না।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা পূরণে কিছু অন্তরায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই প্রকাশ করেছেন যা নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করি। প্রথমত, বিএনপি থেকে টাকা নিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার এ পরামর্শ দেশের প্রচলিত আইন ও নির্বাচনী আচরণবিধির এতে কোনো খেলাপ কি না সেটি আমাদের চিন্তার কারণ নয়, বরং প্রশ্ন ও সংশয় টাকার বিনিময়ে বিএনপি ভোট কেনার চেষ্টা করছে বলে খোদ প্রধানমন্ত্রী যে অভিযোগ তুলছেন, সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের নীরবতা নিয়ে।
দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি গুরুতর অভিযোগ : বিরোধী দল জাল ব্যালট পেপার তৈরি করছে নির্বাচনকে সামনে রেখে। অভিযোগটি প্রণিধানযোগ্য এ জন্য যে, গত ’৮৬, ’৮৮-র নির্বাচন এবং বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও জাল ব্যালট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে বারবার। ধানক্ষেতে ব্যালট বই খুঁজে পাওয়া, কোনো কোনো কেন্দ্রে মোট ভোটের চেয়ে বেশি ভোট কাস্ট হওয়া বস্তুত নকল ব্যালটের অস্থিত্বই যেন বারবার প্রমাণ করছে।
এটি জাল নোট বা প্রশ্ন ফাঁসের চেয়ে জটিল ও কঠিন কাজ না হলে সেই কারিগররা এ ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে তেমনটি মনে হয় না। সুতরাং ভুয়া ব্যালট প্রতিরোধে আমাদের ১. ব্যালট পেপারের উল্টা পিঠে বুথের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সই ও সিল সংযুক্তকরণ; ২. ব্যালট বাক্সে ফেলার আগে একটির অধিক ব্যালট যে ফেলা হচ্ছে না তা প্রকাশ্যে দেখিয়ে নেয়া; ৩. সরবরাহকৃত ব্যালট, ব্যবহৃত ব্যালট ও অব্যবহৃত ব্যালটের হিসাব সমন্বয় না করে ফল প্রকাশ না করা এবং প্রয়োজনে এজেন্টদের তা গুনে বুঝে দেখার সুযোগ থাকা; ৪. ভোটের পর প্রতিটি বুথের ভোটার সংখ্যা, সরবরাহকৃত ব্যালটের ক্রমিক নম্বর এবং ব্যবহৃত ব্যালটের ক্রমিক নম্বর উল্লেখপূর্বক স্বাক্ষরিত প্রত্যায়নপত্র সব এজেন্ট এবং সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা। দৃশ্যত সরকার ও প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও বিরোধী দলগুলো সবাই একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর থাকার পরও পরপর অশুভ ইবলিশের অনুপ্রবেশ কেমন করে ঘটে তা সবারই জানা, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও নির্বাচন কমিশন একাই এক শ’। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমাদের সেনাবাহিনী প্রশংসনীয় ভূমিকার জন্য জাতির কাছে আজো আস্থার প্রতীক। কিন্তু সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়ার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন ও সরকার সবসময়ই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়ে আসছে বলা যায়। সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর সেনাবাহিনী নামানোর কথা বলা হলো। এরপর বলা হয় ২২ ডিসেম্বর। ২২ তারিখ থেকে সরে এসে ২৪ ডিসেম্বর। ফলাফল একপক্ষ সারা দেশ চষে বেড়ালেও অন্যপক্ষ মাঠছাড়া।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেনাবাহিনী নামানোর দাবিটা গতকালই হঠাৎ নাজিল হলো কী? এরপর সেনাবাহিনীর নিজের থেকে কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না অনিয়ম যাই হোক। তাদের ডাকা হলে কেবল তারা সাড়া দেবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যিনি ডাকবেন তিনি নিজেই সমস্যার কারণ হলে ডাকবেন কেন, যতক্ষণ না কেউ তার অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবেন? গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্যই যদি এত কিছু তা হলে বলব বিব্রত অবস্থা থেকে উঠে এসে ’৯৬ মডেলের একটা নির্বাচনের আয়োজন করে কী কলঙ্ক এড়ানো যায় না? কিন্তু যতই পরামর্শ দেয়া হোক ‘বিব্রত’ সিইসি তা হয়তো শোনবেন না। কারণ তার টার্গেট বোধ করি ’৮৬ মডেলের ‘গ্রহণযোগ্য’ একটা নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন প্রকৃত অর্থেই বিব্রত না হলে ‘লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীনদের ভাষায় সাফাই গাইতে পারলেন কেমন করেÑ যখন হামলা-মামলা গ্রেফতার অভিযানের শিকার কেবল এক পক্ষই। আমরা তো এখন কথায় কথায় ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা শুনি। সিইসি তেমন একটা হুঙ্কার দিতে সমস্যা ছিল কোথায়? ‘বিব্রত’ সিইসি প্রকারান্তরে সন্ত্রাসের মোকাবেলায় নিরপেক্ষতার নীতিই গ্রহণ করলেন তা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় সৃষ্টিকারীদেরই প্রশ্রয় জোগাচ্ছে অতীতের মতোই। ৩০০ আসনের এই জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে একটি জীবনের মূল্য অধিক, এটাই তখন সিইসির দর্শন ও মূল্যায়নÑ তা হলে চলমান খুন-খারাবি ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন ৩০ ডিসেম্বরের পর নাকি এই ডিজিটাল যুগেও সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য আরেকটি নির্বাচন পর্যন্ত সময় নেবেন নির্বাচন কমিশন?
এক দিকে সশস্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, লাঠিয়ালবাহিনী ও বিব্রত নির্বাচন কমিশন। অন্য দিকে নিরস্ত্র জনগণ। নানা অবাঞ্ছিত ও অভিনব শর্ত আর কালাকানুনের বেড়াজালে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের অন্ধ, বধির ও বোবার ভূমিকায় অভিনয়ে রেখে একটা ‘কলঙ্কমুক্ত’ নির্বাচনের প্রত্যাশা বা প্রতিশ্রুতি সদিচ্ছাপ্রসূত না অন্য কিছু? ইসি সচিব তো রাখ-ঢাক না করেই বলে দিয়েছেন পর্যবেক্ষকেরা কেবল ‘মূর্তির মতো’ দাঁড়িয়ে থেকে পর্যবেক্ষণই করবেন, এর বেশি কিছু নয়। সাংবাদিক আর পর্যবেক্ষকেরাও মোবাইল-ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবেন না, ছবি তুলতে পারবেন না, ভেতরের কোনো খবর বাইরে প্রকাশ করতে পারবেন না অনুমতি ছাড়া, কোনো কিছু স্পর্শও করতে বা কারো সাথে কথা বলতে পারবেন না, এমনকি পরিচয়পত্রের ধারক হলেও অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারবেন না। এমন আজগুবি শর্ত আসলেই বিব্রত ও বিভ্রান্ত না হলে কেমন করে সম্ভব? এক শর্তাবলি থেকে কী একই অনুমিত হয় না যে, কমিশন কিছু একটা লুকাতে চায়, তাহলে সেটা কী? হ
