বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নতুন ভর্তি হয়েছি। আপনারা সবাই হয়তো জানেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত হয়ে এলে সবকিছু যেন অন্যরকম লাগে। নিজেকে বেশ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে হয়। গায়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নতুন বাতাস’ লাগে। সব কিছু ঘুরে দেখতে ইচ্ছা করে। একদিন বন্ধুকে নিয়ে চারুকলা অনুষদের দিকে খেতে গেলাম। খাবার সময় তর্কাতর্কির আওয়াজ পেয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, একজন ভদ্রলোক রিকশাওয়ালার সাথে তর্ক করছেন। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেই মনে হলো। সম্ভবত ভাড়া নিয়েই তাদের মধ্যে বচসা। একপর্যায়ে ভদ্রলোক রিকশাওয়ালাকে বিশ্রী ভাষায় গালি দিয়ে বললেন, জানিস, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার! রিকশাচালক কোনো কথা না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। আমার মনে হলো, যেন মাটির সাথে মিশে গেছি। নিজেকে আমার বড় ক্ষুদ্র মনে হলো। হায়! তিনি কোনো না কোনো বিভাগের শিক্ষক। তিনি যেহেতু আমার প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক, সেই হিসেবে তো তিনি আমারও একজন শিক্ষক! যাদের কাছ থেকে আমাদের মূল্যবোধ শেখার কথা, তাদের এমন আচরণ বড় পীড়া দিলো। বহু শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেছি।
আমার প্রাথমিক জীবনের শিক্ষক রতন মিত্র, নিত্য স্যার ও মাধ্যমিক জীবনের শিক্ষক আবদুল ওহাব, দুর্গা স্যার, অমর স্যারের দিকে তাকালেই শ্রদ্ধার উদয় হতো। তাদের অনুপম চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব আমাদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষণ করত। তাদের মতো মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক আজ বিশ্ববিদ্যালয় নামক সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও নেই।
যখন আমরা দেখি, আমাদের এই পথপ্রদর্শকেরা কেউ কেউ কারসাজি করে ডিগ্রি নেন, কোন্দলকে প্রকাশ্যে টেনে আনেন, নিজেদের স্বার্থে ছাত্ররাজনীতিকে ব্যবহার করেন; তখন আমরা হতাশ না হয়ে পারি না।
অসুস্থ ছাত্ররাজনীতি আমাদের শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে প্রতিনিয়ত। কিছু মানুষ ব্যক্তির স্বার্থ হাসিলের জন্য হানাহানি ও অসুস্থ এই প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রেখেছে। শিক্ষাঙ্গনগুলো মাদকের ভয়াল থাবায় ক্ষতবিক্ষত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে যখন মাদক ব্যবসায়ের মতো জঘন্য কাজের সাথে জড়িত দেখি, তখন শঙ্কিত না হয়ে পারি না। কোন অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম?
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার চর্চা তেমন হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের কতটুকু সম্মান করে? একজন মাধ্যমিক পড়ুয়া ছাত্র যখন তার শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার মতো দুঃসাহস দেখায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতার চর্চা কতটুকু হচ্ছে।
একজন ছাত্র কেন তার শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার মতো ধৃষ্টতা দেখাবে? তবে কি আমাদের শিক্ষকেরা এ প্রজন্মকে শেখাতে ব্যর্থ? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজ মূল্যবোধের চর্চা হচ্ছে না এবং মানুষ হওয়ার ছবক দেয়া হচ্ছে না; ঠিক তেমনি পরিবারের দায়ও এখানে কম নয়। বাবা-মা সন্তানদের খোঁজ খবর কতটুকু রাখেন? সন্তানদের কতটুকু সময় দিচ্ছেন?
সম্প্রতি ঢাকাসহ বেশ কিছু জায়গায় কিশোর অপরাধীর সৃষ্টি হয়েছে। এরা নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এর কারণ কী? বাবা-মায়ের দায়িত্বহীন আচরণ কি এ ক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী নয়? সন্তানের মূল্যবোধ শেখার একটা জায়গা হলো পরিবার। এখান থেকে যদি মূল্যবোধের চর্চা শুরু না করা যায়, তা হলে পরবর্তী জীবনে এসে শেখা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের শিক্ষা আসলে সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তা না হলে নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট বিক্রি হবে কেন? সার্টিফিকেট দেখে আমরা যখন শিক্ষার মান বিচার করি, তখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য গৌণ হয়ে যায়। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নতুন ভর্তি হয়েছি। আপনারা সবাই হয়তো জানেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত হয়ে এলে সবকিছু যেন অন্যরকম লাগে। নিজেকে বেশ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে হয়। গায়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের...
