কথায় আছে, দুনিয়ায় দু’ধরনের মানুষ আছেন। যারা অন্যের বিজয়ে আনন্দিত হন। একজন বাবা আর অন্যজন শিক্ষক। বাবা চান সন্তান তাকে সাফল্যে ছাড়িয়ে যাক। শিক্ষক চান শিক্ষার্থী তার চেয়ে উঁচু পদে প্রতিষ্ঠা পাক।
আমাদের দেশে আগের দিনে এমন অনেক শিক্ষক ছিলেন; যারা ছিলেন সব বিষয়ে পণ্ডিত। ছিলেন ব্যক্তিত্ববান। ক্লাসের পড়া না পারলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের সহ্য করতে হতো বেত্রাঘাত। এখন অবশ্য বেত ও বেত্রাঘাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুটোই নিষেধ। বাদশাহ আলমগীরকে নিয়ে লেখা শিক্ষকের মর্যাদা পদ্যটি এখনো স্মরণ করেন অনেকে। ভারতীয় উপমহাদেশের এই বাদশা, নিজের ছেলে শিক্ষকের পা হাত দিয়ে ধুয়ে দেয়নি বলে ব্যথিত হয়েছিলেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ। বলা হচ্ছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সেই শ্রদ্ধাবোধ এখন লুপ্তপ্রায়। শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষককে অপমান ও অবরুদ্ধ করছে, এমন ঘটনা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এমনটি ঘটছে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। পরীক্ষার খাতায় অল্প নম্বর বা ফেল করিয়ে দেয়ার ভয় তুলে, শিক্ষার্থীদের অসহায় করা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকের হাতে ধর্ষণের মতো ঘটনা সত্যিই লজ্জার। প্রশ্ন হলো, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরম শ্রদ্ধবোধ হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী কে? যুক্তির খাতিরে বলতে হয়, এর দায় উভয়কে বহন করতে হবে। তবে এ জন্য বেশি দায়ী শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ। শিক্ষার্থী কেবল সনদ পেতে শিখতে আসছে। আর শিক্ষক পেশাকে বেছে নিচ্ছেন অর্থ উপার্জনের বাহন হিসেবে। জ্ঞান বিতরণ ও অর্জন; উভয়ই উদ্দেশ্য থেকেই উভয়পক্ষের বিচ্যুতি ঘটেছে। এ সমস্যা দূর করা সম্ভব ছিল শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু সেই উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে, শিক্ষার্থী ছুটছে খাতায় নম্বর পাওয়ার সড়কে। আর শিক্ষক বসে আছেন ফাঁদ পেতে।
আমাদের দেশে অতীত দিনে অনেকে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন মহান পেশা ও দায়িত্ব হিসেবে। একজন সৎ শিক্ষক শিক্ষকতাকে পেশা না ভেবে, দায়িত্ব ভেবে বেশি আনন্দিত হন। সে দায়িত্ব দেশ ও জাতির কল্যাণে পালন করা হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন তার ছেলের শিক্ষকের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ইতিহাস বিখ্যাত ওই চিঠিতে শিক্ষকের উদ্দেশে তিনি লেখেন, ‘আমার ছেলেকে আপনার কাছে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠালাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন- এটিই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।’ একজন প্রকৃত শিক্ষকের প্রধান কাজ এটি। সমাজ-রাষ্ট্র সংস্কারে শিক্ষকেরাই আলোর প্রদীপ জ্বালেন। শিক্ষকেরা সে দায়িত্ব নিলে একটি জাতি সভ্য হিসেবে গড়ে ওঠে। তবে বেদনার বিষয়, আমাদের অনেক শিক্ষকই ওই দায়িত্ব থেকে অনেক দূরে সরে আছেন। কিছু শিক্ষক অসৎ পন্থা অবলম্বন করায় অনেকে গোটা শিক্ষক শ্রেণীকে সমালোচনা করায় ব্যস্ত। শিক্ষকেরা যদি যৌন হয়রানি, চাটুকারিতা ও দুর্নীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের সম্মান করবে, এটিই স্বাভাবিক। তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রগাঢ় প্রদ্ধাবোধ আমাদের সমাজে ফের ফিরে আসবে। হ