দেশে যেভাবে হু হু করে ওষুধের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করার মতো সরকারের কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। ওষুধ নিয়ে দেশে-বিদেশে মুনাফাবাজি, মজুদদারি আর অন্যবিধ নানা কলাকৌশলের অন্ত নেই। এরপর রয়েছে ভেজাল ওষুধের দৌরাত্ম্য। দেশের ফার্মেসিগুলোর রমরমা ব্যবসা। কোথায় যাবে রোগীরা? দেশে এখন ক্যান্সারের কেমো, যা ব্যয়বহুল, এরও নকল বের হয়েছে। আবার এসব ওষুধ নামী-দামি ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে। কিছু দিন আগে র্যাব অভিযান চালিয়ে কেমোসহ বিপুল ওষুধ, ইনজেকশন উদ্ধার করেছে। এ ধরনের কেমো রোগীর জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। উন্নত দেশগুলোয় জনসচেতনতা ও সরকারি কড়াকড়ির ফলে মূল্যবৃদ্ধির এ ধরনের অপকৌশল থেকে ওষুধ প্রস্তুতকারী ও ব্যবসায়ীরা কিছুটা নিবৃত্ত থাকলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ পুরোপুরিই অসাধু ব্যবসায়ীরা গ্রহণ করে থাকেন। এ ব্যাপারে শুধু নিজ নিজ দেশের ব্যবসায়ী ও লাইসেন্স ব্যবহারকারী ও প্রস্তুতকারীরাই যে তাদের সহযোগিতা করে থাকে তা শুধু নয়, প্রশাসনের একটি অংশও এ ব্যাপারে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ব্যাপারে তো কথাই নেই, এমনকি অপ্রয়োজনীয় নানা সিরাপ, টনিক ও ট্যাবলেট জনপ্রিয় করা নিয়েও বাজারে অনেক কথা শোনা যায়। অভিযোগ, আজকাল অনেক ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানে নেশাজাতীয় অবৈধ ইনজেকশন, ট্যাবলেট, সিরাপ, মাদক, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি বিক্রি করে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছে অনেকে। এটাও একধরনের অপরাধ। এতে যুবসমাজ ধ্বংস হতে বাধ্য এবং সমাজে অবক্ষয় দেখা দেয়। এটা প্রতিরোধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
আমাদের দেশে নানা প্রকার অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, সিরাপ, ট্যাবলেট দীর্ঘ দিন ধরে ওষুধ প্রস্তুতকারী বিরাট বিরাট প্রতিষ্ঠানের ঘরে কোটি কোটি ডলার তুলে দিয়েছে। দেশে ওষুধ নীতির কার্যকারিতা নেই বহু ক্ষেত্রে। জবাবদিহি ও নজরদারি ওষুধ প্রশাসনে তেমন নেই। নানা বাহানায় দেশে দফায় দফায় জীবনরক্ষাকারী নানা ওষুধের পাশাপাশি সাধারণ ওষুধের মূল্য বৃদ্ধিতে জনগণ অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ। কোনো প্রকার ঘোষণা বা কারণ ছাড়াই দেশে ঘন ঘন ওষুধের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এ ধরনের নজির নেই। বাংলাদেশের হঠাৎ ওষুধের গায়ে দাম বৃদ্ধি দেখানোর কারণে রোগীরা ক্ষুব্ধ আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নীরব-নির্বিকার। এ অবস্থা থেকে জনগণ আশু পরিত্রাণ পেতে চায়। দেশে শহর, বন্দর, গ্রামে ও অলিত গলিতে যত্রতত্র লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। এসব ফার্মেসিতে বেশির ভাগ নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রয় করা হয়। দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগত মান রক্ষায় অবহেলা ও উদাসীনতা দেখিয়ে থাকে। ওষুধের মানের অভাবে আমাদের দেশে অনেক ওষুধ চিকিৎসাসেবায় অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। ভূঁইফোড় কোম্পানিগুলো ডাক্তার ও ফার্মেসিগুলোকে বিপুল উপঢৌকন-উপহার সামগ্রী দেয়ার মাধ্যমে নিম্নমানের ওষুধ কৌশলে বিক্রি করে চলছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগানো হয়ে থাকে। দেশে প্রস্তুতকৃত ওষুধের মূল্য যখন বৃদ্ধি করা হয় তখনও আমদানিকৃত ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির অর্থাৎ বর্ধিত কোনো কর আরোপের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে প্রতিযোগিতার দিক থেকে বিদেশ থেকে আনা ওষুধ দেশে প্রস্তুত ওষুধের তুলনায় অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়ে যায়।
প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশেই প্রস্তুত হোক। তা মানের দিক থেকে বিদেশী ওষুধের সমকক্ষ হয়ে উঠুক। এটা ওষুধ নীতির ঘোষণার পর থেকে সবাই আশা করেছিল। কিন্তু দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারীরা সেই আশা আজো পূরণ করতে সক্ষম হননি। ওষুধ প্রশাসন লোকবলের অভাবে দেশী ওষুধের মান উন্নয়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে একশ্রেণীর লোক বিদেশী ওষুধের শূন্যস্থান নিচু মানের ওষুধ দিয়ে পূরণ করে আসছে। তা ছাড়া দেশের বাজার বিদেশী ওষুধে সয়লাব। দেশে যে হারে ভেজাল ও নকল ওষুধের আবির্ভাব দেখা দিয়েছে, তা রোধ করার জন্য প্রশাসনকে পুরো মাস মাঠে থাকতে হবে। ঘন ঘন ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এখনই রোধ করতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’য় ওষুধ নীতি মূল্যহীন হয়ে পড়বে। জনদুর্ভোগ দূর করার জন্য সরকারকে সচেষ্ট হওয়ার অনুরোধ করছি। হ