বাংলাদেশে অনেক ভালো ভালো আইন আছে। কিন্তু এগুলোর বাস্তবে প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত হয়েছে বা ভবিষ্যতে হবে তা জনগণ বিবেচনা করবে। বলতে দ্বিধা নেই, ট্রাফিক আইন ২০১৮ একটি দারুণ আইন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান যান চলাচল ব্যবস্থা ও রাস্তার পরিস্থিতি বিবেচনায় এই আইন কতটা যুগোপযোগী? এই আইন যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অসঙ্গতিপূর্ণ তা বুঝতে বা বলতে সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। নতুন সড়ক পরিবহন আইন দেখে অনেকটা এমন মনে হচ্ছেÑ দেশে সব অপরাধ বুঝি গাড়িচালকেরাই করে। চালকেরা পেশা হিসেবে এটা বেছে নিয়ে মহা ভুল করেছে। কারণ, এই আইন বুঝতে না পারার খেসারত বা অজ্ঞতা নিঃসন্দেহে রাস্তাঘাটে কিছু চালককে নিঃস্ব করে ছাড়বে। কেউ কেউ চাকরি, রুটি-রুজি হারাবে। কেউ কেউ ধারণা করছেÑ নতুন বিধি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপরি আয় কয়েক গুণ নয়; শতগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই আইনের জরিমানা বা শাস্তি দেখে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন, ‘আইন ইউরোপ-আমেরিকার মতো, কিন্তু দেশের রাস্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আফ্রিকার মতো।’ তাই সরকারের উচিত, বর্তমান নাজুক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়কের প্রেক্ষাপটকে অগ্রাহ্য না করে, ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের’ পুরোধা ইলিয়াস কাঞ্চনের কথা এবং শ্রমিক-মালিকদের সংগঠনের সুপারিশ সমন্বয় করে জরিমানা বা শাস্তির বিধান করা। যেখানে মানুষের নাগরিকবোধ ও সাধারণ বোধের খুব অভাব সেখানে শুধু চালকদের বলির পাঁঠা বানালে লাভের লাভ তেমন কিছু হবে না। সুষ্ঠু এবং সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জ্যামমুক্ত শহর গড়ে তোলার স্বপ্ন আজীবন অধরাই থেকে যাবে। লাভ হবে গুটিকয়েক অসাধু ট্রাফিক ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মানুষের। তাছাড়া মহাসড়ক ও সাধারণ সড়কগুলোর প্রত্যাশিত মানের উন্নতি না হওয়া বা ক্ষেত্রবিশেষে বেহাল দশা, ফুটপাথ, ফুটওভার ব্রিজ খুব জবুথবু অবস্থায় রেখে শুধু চালকদের নিয়ন্ত্রণের কথা সামনে রেখে আইন করলে তার আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে বাধ্য।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, গাড়ি চালিয়ে কোটি মানুষের মুখে ভাত, পরনে কাপড় এবং তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও স্কুল-কলেজের বেতন হয়। হাজার হাজার তরুণ এখন বাইক চালিয়ে বেকারত্ব ঘুচিয়েছে। নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছে প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ। অনেক ছাত্র এখন বিভিন্ন অ্যাপসে রাইড শেয়ারিং করে নিজে চলে এবং লেখাপড়ার খরচ চালায়। এখন কোনো ছাত্র যদি আইনের অপপ্রয়োগে পড়ে যায়; তবে তাকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে ক্ষণিকের জেল জীবন বরণ করে নিতে হতে পারে। পাশাপাশি লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম হতে পারে। সারা জীবনের জন্য হয়ে যেতে পারে জেলখাটা দাগী আসামি। সমাজে হারাতে পারে তার সম্মান ও অবস্থান। চালক বাবার সন্তানেরা অভুক্ত থেকে দিন কাটাতে পারে; বন্ধ হতে পারে স্বপ্নের চাষাবাদের লেখাপড়া।
শুধু ঢাকা শহরেই ত্রিশ লাখের অধিক প্রাইভেট যান আছে; যার পেশাদার চালক থাকার পাশাপাশি মালিকের প্রয়োজনের তাগিদে এবং শৌখিনতার কারণে গাড়ি চালান। সদ্য প্রণীত ট্রাফিক আইন এসব ক্ষেত্রেও অনভিপ্রেত অবস্থা তৈরি করতে পারে।
অবশ্য এই ট্রাফিক আইন যদি সরকারের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে জনগণের আইওয়াশ ও তথাকথিত সুশীলসমাজের সন্তুষ্টির জন্য করে তাহলে বলার কিছু নেই। তবে আমি মনে করতে চাই নাÑ বর্তমান সরকার সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন বা আবেগের বশবর্তী হয়ে ট্রাফিক আইন ২০১৮ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। আইনটি আবার বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ এই আইন চালকদের ক্ষেত্রে একটু বেশিই রূঢ় হয়ে গেছে।
গাড়িচালকেরা যদি অন্যায়ভাবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটায় তবে তার শাস্তি যদি দণ্ডবিধি অনুযায়ী ফাঁসি হয়, তবে সবাই এক শ’বার সেটির পক্ষে। কিন্তু কোনো চালক যদি পরিস্থিতি বা পথচারীদের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয় তবে এটি সমাজের অন্য দশটা অপরাধের মতো বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান আইনে বিচার করতে হবে। সে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে বেকসুর খালাস করে দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, যাত্রীরা প্রভাবিত করে চালককে গাড়ি দ্রুতগতিতে চালাতে। দ্রুত গাড়ি চালাতে বাধ্য করতে বিভিন্ন কটূক্তি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ড্রাইভার আবেক নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রেগে গাড়ি দ্রুত চালাতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দোষ গিয়ে পড়ে চালকের ওপর। যদিও নতুন ট্রিপ ধরতে অন্য গাড়ির সাথে প্রতিযোগিতা করে ওভারটেক করতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার দায়ও অবিবেক চালককে নিতে হবে। সবচেয়ে দামি কথা হচ্ছে চালক, যাত্রী বা পথচারী কারোই কোনো অধিকার নেই অন্যের জীবন কেড়ে নেয়ার বা নিজের জীবনকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নিজের ও পরের মৃত্যুর কারণ হওয়ার। এখানে দ্বিমুখী দায়িত্বশীলতা অতি জরুরি বলে বিবেচিত। অন্য দিকে, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়Ñ দেশের জনমনে বদ্ধমূল ধারণা, এ দেশের ট্রাফিক পুলিশ সড়ক ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পেশাদারিত্ব দেখাতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। শুধু তাই নয়, তারা মনে করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত পুলিশ সদস্যরা নানা ধরনের দুর্নীতি ও অসদাচরণ করে থাকে। এমতাবস্থায় তাদের নৈতিক ও পেশাদারিত্বের উন্নয়ন না ঘটিয়ে হঠাৎ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে জরিমানার অর্থ ও শাস্তি বাড়ানো তাদের অর্থ লিপ্সাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে, যা নিয়ম শৃঙ্খলার মূল দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ বাহিনীকে আরো বিতর্কিত করে তুলতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। পুলিশ বাহিনী পূর্ণ পেশাদারিত্ব ছাড়া জরিমানা ও দুর্ঘটনায় শাস্তি বাড়ানো হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া সমুচিত হবে না।
তাছাড়া নতুন আইনে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ২৫০০০ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের জেলের বিধান রাখা হয়েছে, যা পরিস্থিতি বিবেচনায় বেশি বলেই মনে হয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও জরিমানা ও শাস্তি কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখার দাবি রাখে। কারণ এ দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে চালক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বেসরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন যে সব ড্রাইভিং স্কুল বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে তার অবস্থা ভালো নয়। যাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের প্রশিক্ষিত চালকের চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই ড্রাইভিং শেখার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি না করে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালনার জরিমানা ও শাস্তি কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে।
সরকার একটা বিষয় ভেবে দেখতে পারেÑ গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম করলে জরিমানা করবে এবং সেই জরিমানার টাকা নিয়ে তার সমাধান করা যেতে পারে। যেমন যাদের হেলমেট নেই তাদের জরিমানার টাকা দিয়ে হেলমেট দেয়া হোক। যার লাইসেন্স নেই তাকে জরিমানার টাকা দিয়ে সহজে লাইসেন্সপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হোক। এটি করলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রভাব পড়বে বলে মনে হয়। কারণ বাংলাদেশে গাড়ি কিনতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা; কিন্তু গাড়ির লাইসেন্স পেতে ১ বছরও লেগে যায়। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ভোগান্তির কোনো সীমারেখা নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স সহজে পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির প্রচলন করা যেতে পারে। হ
লেখক : এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে অনেক ভালো ভালো আইন আছে। কিন্তু এগুলোর বাস্তবে প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত হয়েছে বা ভবিষ্যতে হবে তা জনগণ বিবেচনা করবে। বলতে দ্বিধা নেই, ট্রাফিক আইন...
