ঢাকার বাতাসে ভয়াবহ বিপদ! নগরবাসী প্রতিনিয়ত বিষ গ্রহণ করছে! খাবারে, বাতাসে, পানিতে, মাছ-ফল-সবজি সব কিছুতেই বিষ। চলাফেরায় ঝুঁকির কাথা না বলাই ভলো। পৃথিবীর যেসব শহর বায়ুদূষণে ধুঁকছে, বরাবরই সেই তালিকার শীর্ষের দিকে ঢাকা। ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অনুসারে, বিশ্বের যে পাঁচ দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, বাংলাদেশ এদের অন্যতম। বৈশ্বিকভাবে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে একদিন বেশির ভাগ সময় ঢাকাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। ঢাকা কেন বারবার দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় প্রথম হবে? দেশে বায়ুদূষণ রোধে অনেকগুলো সংস্থা দায়িত্বপ্রাপ্ত। বায়ুদূষণের কারণগুলো দূর করার বিষয়ে এসব সংস্থার কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। কালো ধোঁয়াসহ ক্ষতিকর বস্তুকণা বাতাসে ছড়ানো ফিটনেসহীন মোটরযানগুলোর চলাচল বন্ধের দায়িত্ব সড়ক পরিবহন সংস্থার। ঢাকার চার পাশের ইটভাটার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিতের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতরের। রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজের সময় ধুলা উড়া বন্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাধ্য করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। রাজধানীর সড়কে ধুলা নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন সকালে দুই সিটি করপোরেশন থেকে পানি ছিটানোর নিয়ম। সিটি করপোরেশনের কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই।
ঢাকার বায়ুদূষণ যেন ‘বিনা পয়সার’ সদাই, যা সবাইকে ইচ্ছাই হোক, অনিচ্ছায় হোকÑ নাকে, চোখে, মুখে, শুধু ভোগই নয়, উপভোগও করতে হচ্ছে। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা বা রাত কোনো সময়ই ধুলা আর ধোঁয়ার ছোঁয়া থেকে মুক্তি নেই। বহু আগেই ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে যেমন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তেমনি জলাশয় সংরক্ষণ ও নতুন করে তা গড়ে তোলারও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। বর্তমানে রাজধানীর বায়ুর মান এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, বায়ুদূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট হিসেবে ঘোষণা ও পরিবেশগত ‘জরুরি অবস্থা জারি’ করার সময় এসেছে।
বায়ুদূষণ মোকাবেলার প্রথম কাজ হচ্ছে দূষণের উৎস বন্ধ করা। পরের কাজ হচ্ছে শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জলাশয়গুলো রক্ষা করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিইউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইপিএর হিসাবে কোনো একটি শহরের বায়ুর মানের সূচক ২০০-এর বেশি হলে তাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। সম্প্রতি ঢাকার বায়ুর মানের গড় সূচক ছিল ২২০। এর মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকার বায়ুর মান ছিল ২৯৮, যা মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। কোনো শহরের বায়ুর মানের সূচক ২০০ ছাড়ালে ওই শহরের মানুষকে মাস্ক (মুখোশ) পরার পরামর্শ দেয়া হয়। ঘরের জানালা বন্ধ রাখতে হয়, সাইকেলে চড়া নিষেধ করা হয়। শিশু ও বৃদ্ধদের খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করা হয়।
রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় বায়ুদূষণ রোধে নীতিমালা প্রণয়নে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওই কমিটি বায়ুদূষণ রোধে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং আরো কী কী উপায়ে বায়ুদূষণ রোধ করা যায়; সে ব্যাপারেও আদেশ দেয়া হয়েছে। জনস্বার্থে পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) এক সম্পূরক আবেদনের শুনানিতে এ আদেশ দেন। এ ছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এলাকায় অবৈধ ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেন আদালত। সেই সাথে রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাথে ধুলোবালু, ময়লা ও বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ চলছে এবং যেসব এলাকায় ধুলোবালু বেশি, সেসব এলাকায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দিনে দু’বার পানি ছিটাতে দুই সিটির মেয়র ও নির্বাহীদের নির্দেশ দেন আদালত।
বাতাসে অতিমাত্রায় ধুলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শহরের গাছগাছালিও। গাছের পাতায় জমছে ধুলার আস্তরণ। এর ফলে গাছের খাদ্য ও অক্সিজেন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, পাতার পত্ররন্ধ্র ও সূর্যের আলোর মাঝখানে ধূলিকণার আস্তর প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করতেও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে গাছ। সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু খাদ্য তৈরিই করে না, অক্সিজেনও ছাড়ে। মানুষ, জীবজন্তু অক্সিজেনের মাধ্যমে বেঁচে থাকে, আর সেই অক্সিজেনের উৎসই হচ্ছে উদ্ভিদ। ধূলিকণার কারণে সালোকসংশ্লেষণ যেহেতু বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সুতরাং তা আমাদের পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
বাতাসে মিশ্রিত সালফার, সিসা, দস্তা প্রভৃতি ধাতুকণা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; বিশেষত শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে বছরে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার দু-তৃতীয়াংশই বায়ুদূষণের ফলে। বায়ুদূষণের কারণে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যান্সার হয়। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রকট হয়ে থাকে। বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এক লাখ ২৩ হাজার মানুষ শুধু বায়ুদূষণের কারণেই মারা গেছে।
আইন করেও কোনো সরকারের একক উদ্যোগ নিয়ে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। অন্যের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপানোর আগে সর্বসাধারণের সচেতন হতে হবে। সার্বিক দূষণের জন্য মানবসৃষ্ট কারণগুলো অনেকটা দায়ী। তাই সবার ক্ষুদ্র প্রয়াস বিরাট শক্তিরূপে অর্জিত হতে পারে। হ
abunoman1972@gmail.com
ঢাকার বাতাসে ভয়াবহ বিপদ! নগরবাসী প্রতিনিয়ত বিষ গ্রহণ করছে! খাবারে, বাতাসে, পানিতে, মাছ-ফল-সবজি সব কিছুতেই বিষ। চলাফেরায় ঝুঁকির কাথা না বলাই ভলো। পৃথিবীর যেসব শহর...
