রতনে রতন চেনে। মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় তাই হয়েছে। তাদের একজন অধ্যাপক মসিউল আযম (৭৬), অপরজন খন্দকার কবীর হোসেন (৫০)।
দু’জনের সাথেই একান্ত সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে। প্রবীণ সাংবাদিক মসিউল আযম জানালেন, আমার ভাড়াটিয়া বাসা খ্ুঁজছিলেন। এ জন্য হন্যে হয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছিলেন। অবশেষে খুঁজে পেলেন এই বাসভবন। নাম ‘স্বপ্ননীড়’। এতে পূরণ হলো ভদ্রলোকের দীর্ঘ দিনের স্বপ্নের ঠিকানা। এভাবেই তার সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে। প্রায় আট মাস আগে তিনি সপরিবারে উঠেছেন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলায় ‘স্বপ্ননীড়’ বাসভবনে। প্রথম দিনেই তিনি স্বপ্ন ও অভিপ্রায়ের কথা জানালেন। তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম সানন্দে।
গ্রামের এই বাড়িতে ৬৫ শতক জমির ওপর বসবাস। পরিকল্পিত উপায়ে গড়ে তোলা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে শহরের ভাড়া বাসা ছেড়ে চলে আসেন গ্রামে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিয়েশাদির পরই তার এই সিদ্ধান্ত। বর্তমানে বাসায় ফলদ গাছের সংখ্যা ১৫১টি, কাঠ জাতীয় মেহগনি ৬০টি, রকমারি ফুল ৪৫ প্রজাতির। সারা বছর বিভিন্ন ফল-ফুলে গাছপালাগুলো ভরে থাকে। আর প্রতিদিন সকালে পাখির কলতানে ঘুম ভাঙে। কিচিরমিচির আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা বাড়ি। প্রজাপতিরা নেচে বেড়ায় ফুলে ফুলে। দেখলে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
অপর বৃক্ষপ্রেমিক প্রতিরক্ষা বিভাগে কর্মরত। বিদেশে শান্তি মিশনে গিয়ে কুয়েতে তিন বছর ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে চার সদস্যের পরিবার। ছেলে তাসলিম জাহান আবির (১২) স্থানীয় মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণী আর মেয়ে আনিকা কবীর আলীফ (৭) প্রথম শ্রেণীতে পড়াশোনা করে।
বাসভবনে তারা উঠার পরই এক মাসের মধ্যেই একে একে পরিবর্তন চোখে পড়তে থাকে সবার। গাছ পরিচর্যার জন্য গোবর সার, কৃষি যন্ত্রপাতি, ফুলের টব ইত্যাদি সংগ্রহ করা হলো। উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ, বিএডিসির বিভিন্ন নার্সারি থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করতে থাকেন পছন্দের চারাগাছ। গাছ সংগ্রহের নেশা গৃহকর্তাকে পেয়ে বসে। প্রতি সপ্তাহে দু-তিন দিন বিভিন্ন নার্সারিতে গিয়ে ফলের চারা সংগ্রহ করেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ভারত, কঙ্গো, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশ থেকে চারা আমদানি করেছেন। এ জন্য তাকে প্রায়ই যশোর ঝুমঝুমপুরে সুমন ও ভাই ভাই নার্সারিতে যেতে হয়। ওই দুটি নার্সারি বিদেশ থেকে চারা আমদানির ক্ষেত্রে অনেক সহযোগিতা করেছে।
বর্তমানে এ বাগানে দুষ্প্রাপ্য গাছের মধ্যে ননীফল ও সওয়ার সফটের (ক্যান্সার প্রতিষেধক) কয়েকটি গাছ ফলে ভরে গেছে। ব্রুনাই থেকে আমদানিকৃত ব্রুনাই কিং আমগাছে ফল ধরেছে। প্রতিটির ওজন হবে পাঁচ কেজি। এ ছাড়াও টক আতা, রোলিনি, রামবুটান, লাল কাঁঠাল, সাদা জাম, বিচিবিহীন জাম, মিসরীয় ডুমুর, ত্বিন, অ্যাভোকাডো, বারাব্বা, কোকাম, আখরোট, কেপাল, পি নাট বাটার আইসক্রিম, বিনরেড, সানথেলো, বারোমাসি আম (ভিয়েতনামি), হলুদ লংগান, আলফানসো আম, থাই কাটিমন (বারোমাসি) কোরিয়ান জিনসেং ইত্যাদি সর্বমোট গাছের সংখ্যা ২১০, ফুল গাছ আছে ৪২ প্রজাতির।
বাসার ছাদে, কার্নিশে, বাসার নিচে, মাটিতে এক হাজার ১০০ টবে এসব চারাগাছ মনোরমভাবে সাজানো আছে। দেখলে প্রশান্তিতে মন ভরে ওঠে। অনন্য নৈসর্গিক শোভা সেখানে বিরাজ করছে। প্রতিদিন এসব গাছপালা পরিচর্যা করতে তিন-চার ঘণ্টা শ্রম ও সময় দিতে হয়। স্ত্রীও এসব কাজে স্বামীকে সার্বক্ষণিক সাহায্য ও সহযোগিতা করে থাকেন। বাগানে কাজ করার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় প্রশান্তি, উপভোগ করা সম্ভব অনাবিল আনন্দ।
অধ্যাপক মসিউল আযম আলাপচারিতার একপর্যায়ে জানান, তাদের এসব কাজে যতটুকু সহযোগিতা করার প্রয়োজন, সবই করে থাকি। এর আগে বাসভবনে ট্যাংকিতে মোটরযোগে একবার পানি ওঠালে দু-তিন দিন অনায়াসে চলে যেত। সেখানে এখন দৈনিক দু-তিনবার পানি ওঠাতে হয়। এর ফলে আমার বিদ্যুৎ বিলও অনেক বেড়ে গেছে। তবুও এতে কোনো কষ্ট নেই। কেননা, এত বড় একটা মহৎ কাজ, ফল উৎপাদন, পুষ্টি বৃদ্ধিতেÑ সর্বোপরি পরিবেশ উন্নয়নে ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হবে। বৃক্ষপ্রেমিক কবীর হোসেনের সাথে আলাপচারিতায় বলেন, শৈশবে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই গাছ লাগানোর শখ জাগে। পরে নেশায় পেয়ে বসেছে। এটি শিখেছিলাম বৃক্ষপ্রেমিক তার বাবার কাছ থেকেই। বৃক্ষপ্রেমিক দু’জনের বসেছে মেলা এই স্বপ্ননীড়ে বসবাসের মাধ্যমে। উভয়ের স্বপ্নের হয়েছে সফল বাস্তবায়ন।
রতনে রতন চেনে। মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় তাই হয়েছে। তাদের একজন অধ্যাপক মসিউল আযম (৭৬), অপরজন খন্দকার কবীর হোসেন (৫০)।দু’জনের সাথেই একান্ত সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে।...
