করোনাভাইরাস, এক মহামারীর নাম। কোনো অস্ত্র, বোমা-বারুদ ছাড়া পুরো পৃথিবী যার সাথে যুদ্ধ করছে। বলা যায় এক মহাযুদ্ধ। প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ভারী হচ্ছে। মানুষ দিন দিন অসহায় হয়ে পড়ছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ এই ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব অফিস, কারখানাসহ সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। মানুষ আজ ঘরে বন্দী হয়ে থাকছে। সব আয়ের পথ বন্ধ। দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার, ছোট ছোট চায়ের দোকানদার, রাস্তায় হেঁটে হেঁটে যারা পান-সিগারেট বিক্রি করে সবার ঘরে আজ চলছে যুদ্ধ। এসব মানুষ কি দু’বেলা ঠিক মতো খাবার পাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে সেটাও অজানা।
আমি হলফ করে বলতে পারি, সবাই পাচ্ছে না। কেউ কেউ করোনার চেয়ে ক্ষুধাকেই ভয় বেশি পাচ্ছে। এক রিকশাচালক তো বলেই ফেলেছে, ‘আমি করোনায় নয়, ক্ষুধায় মরবো।’ সরকার এসব মানুষের জন্য ত্রাণ দিচ্ছে। ত্রাণ দিচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন, বিত্তবান মানুষরাও। তবুও যেন কোথাও কেউ একজন ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে। তাই আমার কাছে মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এই কথাটি যেন সত্য মনে হয় না। ছেলেবেলা থেকে শুনে আসা এই বাণীটি এখনও মানুষের মাঝে প্রচলিত আছে। শুধু নেই এর বাস্তব প্রয়োগ। যেখানে মানবতা আর মনুষ্যত্ব লোপ পেয়েছে, সেখানে জীবনের জন্য জীবন কে দেবে?
আমরা মানুষকে ত্রাণ দিলেও সবার মাঝে পৌঁছে দিতে পারছি না। খবর নিচ্ছি না কারা সত্যিই ক্ষুধার্ত। কাদের প্রয়োজন ত্রাণ? এই হিসাবটা না করে বেহিসাবে সবাই ভাগ-বণ্টন করে খাদ্য লুটপাট করার নামই হচ্ছে ত্রাণ। সরকারের পক্ষ থেকে আসা ত্রাণ সঠিকভাবে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না সে হিসাব আমরা রাখছি না। কিছু মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে আবার কিছু মানুষ গরিবের হক নষ্ট করছে।
আমাদের উচিত এই অসময়ে প্রকৃত দুস্থ মানুষদের সাহায্য করা। যাকে তাকে ত্রাণ দিয়ে প্রকৃত দুস্থদের বঞ্চিত না করাই প্রকৃত কাজ। অনেকেই হয়তো লজ্জায় বলতে পারছে না, তার ঘরে খাবার নেই। তবে আমাদের উচিত এসব মানুষকে খুঁজে বের করে তাদের হাতে ত্রাণ তুলে দেয়া। আমাদের আশপাশের মানুষ কিন্তু জানে কার ঘরে কী অবস্থা। তবুও যেন কেউ কারো নয়।
কারো জন্য কারো মায়া এ সমাজে নেই বললেই চলে। নিষ্ঠুর এ সমাজে যারাই মানুষের উপকারে কাজ করে তাদের পেছনেও নোংরা মানুষরা লেগে থাকে। হাজার মিথ্যা অপবাদ ছড়ানোর মাধ্যমে ভালো কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অপচেষ্টা করে এসব মানুষ। তবুও ভালো কাজ করেন এমন মানুষ পৃথিবীতে থাকবে এবং মানুষের জন্য কাজ করবে। তবে তাদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। যেখানে দিন দিন ভালো কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা সেখানে কমে যাওয়াটা ভালো লক্ষণ নয়।
শুধু তা-ই নয়, এখন নিষ্ঠা আর সততা খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। যেখানে অসহায় গরিবরা ত্রাণ পাচ্ছে না, সেখানে সততা আর নিষ্ঠা খুঁজতে যাওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের দেশে ছোট থেকে বড় সব কাজে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। সেটা হোক গরিবের ত্রাণ কিংবা জনগণের উন্নয়নের টাকা। দুর্নীতি হবেই হবে। আর এই দুর্নীতির জন্যই দেশ যতটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ততটা এগিয়ে যেতে পারছে না।
আজ গরিব-দিনমজুরের ঘরে হাহাকার। সন্তানের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য বাবা পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছে। ঘরে স্ত্রী-সন্তান না খেয়ে আছে এই যন্ত্রণা নিয়ে স্বামী রিকশা নিয়ে বের হচ্ছে। আর পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়ে ঘরে ফিরছে। এই হচ্ছে আমাদের মানবতা। এই হচ্ছে সোনার বাংলা। পকেটে টাকা নেই, ঘরে চাল নেই, ডাল নেই। কে দেবে আহার? এমন প্রশ্ন নিয়ে কাজ খুঁজতে যাওয়া দিনমজুর পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ঘরে ফিরেছে। সন্তান যখন প্রশ্ন করে, বাবা খাবার এনেছ? তখন হয়তো বাবার চোখের অশ্রু বিসর্জন দেয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। কী আর করতে পারে! ভিক্ষা? ভিক্ষুকরাও বোধহয় রাস্তায় থাকতে পারছে না। আর ভিক্ষা দেবে কে? রাস্তায় তো মানুষই নেই। আর এখন যে পরিস্থিতি সেটা হচ্ছে আমি ভালো আছি তাতেই যথেষ্ট। কে কেমন আছে সেটা দেখার সময় নেই। বলা যায় ইয়া নাফছি ইয়া নাফছি করার যুগ এখন। সবাই এখন তেমনি করছে।
মাস চারেক আগের কথা। আমি রাতে আর দুপুরে ভাত খাইনি। সকালে নাশতাও করিনি। শুধু পানি পান করেই আছি। বাবা-মায়ের সাথে রাগ। বিকেলে খেলতে এসেছি মাঠে। শরীর খুব ক্লান্ত। আমার এক বন্ধু দেখেই বুঝেছে। জিজ্ঞেস করেছে কী হয়েছে? তোর চেহারা বলছে কিছু একটা হয়েছে। আমি তাকে সব কিছু বললাম। তারপর সে আমায় বলল, চল আমার বাসায় ভাত খাবি। আমি বললাম না। সে আমায় তখন বলল, এখন কেউ না খেয়ে থাকলেও কারো খবর নেয় না। কেউ খাইনি বললেও বলে না আমার কাছে আছে খাও। আমি তোর ক্লোজ বন্ধু তাই বলছি। তার ওই কথাটা তখন হেসে উড়িয়ে দিলেও বাস্তবতা ঠিক তেমন। এতে এটা বোঝা যায় যে, এখন মানুষের ভেতর মনুষ্যত্ব আর মানবতা হারিয়ে গেছে।
আসুন আমরা একটু মানবিক হই, মানবতার পরশ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিই। সরকার এবং প্রশাসন যথেষ্ট চেষ্টা করছে সবার ক্ষুধা দূর করতে। অভুক্ত কাউকেই রাখতে চাইছেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তার একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন প্রতিটি সমাজ, ওয়ার্ডভিত্তিক সহযোগিতা। রাতের আঁধারে হলেও সেসব মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক
azharmahmud705@gmail.com
করোনাভাইরাস, এক মহামারীর নাম। কোনো অস্ত্র, বোমা-বারুদ ছাড়া পুরো পৃথিবী যার সাথে যুদ্ধ করছে। বলা যায় এক মহাযুদ্ধ। প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ভারী হচ্ছে। মানুষ দিন...
