বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়নকল্পে একটি বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে। আইনটির নাম সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬১ নং আইন)।
বাংলাদেশে সম্প্রতি দুই-তৃতীয়াংশ জেলায় নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) ছড়িয়ে পড়ায় পুরো দেশকে ঝুঁঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। ওই আইনের ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে গত ১৬ এপ্রিল সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতর এক বিজ্ঞপ্তিতে ওই ঘোষণা দেয়। দেশের সাধারণ জনগণ নতুন আইনটি সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ। কারণ, এ ধরনের ভয়ঙ্কর জীবাণুবাহী ছোঁয়াচে রোগ আমাদের জন্য একেবারেই নতুন। যেখানে পুরো উন্নত বিশ্ব এর মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে সেখানে এই রোগ প্রতিরোধে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ। কেননা, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শিকার একেকজন ব্যক্তি একেকটি মানব বোমা, যার সংস্পর্শে এলে শত শত মানব বোমার সৃষ্টি হয়। এর আগে আমরা ম্যালেরিয়া, কলেরা, ফাইলেরিয়াসিস, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এভিয়ান ফ্লু, নিপাহ ভাইরাস, অ্যানথ্রাক্স, মার্স-কভ, জাপানিস এনকেফালাইটিস, ডায়রিয়া, যক্ষ্মা, শ্বাসনালীর সংক্রমণ, এইচআইভি, এইডস, ভাইরাল হেপাটাইটিস, মেনিনজাইটিস, ইবোলা ভাইরাস, জিকা, চিকুনগুনিয়া, প্লেগ প্রভৃতি সংক্রামক ব্যাধির নাম শুনলেও করোনাভাইরাস সম্পূর্ণ নতুন, যার কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার হয়নি। ফলে সরকার আইনটির ৪(ভ) ধারার বিধান মতে, নতুন জীবাণুবাহী ব্যাধি নভেল করোনাভাইরাসকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সংক্রামক ব্যাধি ঘোষণা করেছে। সাথে সাথে পুরো দেশকে ওই বিশেষ আইনের আওতায় ঝুঁঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে তা প্রতিরোধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। পুরো সিভিল প্রশাসনযন্ত্রের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রতিরক্ষাবাহিনীকেও মাঠে নামানো হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারার বিধান মতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার ওই সরকারি নির্দেশ তথা বিশেষ আইনটি কার্যকর করতে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করারও ক্ষমতা রাখে। তা ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্রেটরা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্ত আইন ভঙ্গকারীকে তাৎক্ষণিক সাজা, জরিমানা ইত্যাদি করেছে বিধায় এ সম্পর্কে সূক্ষ্ম জ্ঞান থাকা জরুরি। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৬৯, ধারায় অবহেলামূলক কাজ করে জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণ বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে বা বিস্তার করে তার ছয় মাস পর্যন্ত কারাদ-, ২৭০ ধারা বিদ্বেষপ্রসূত কাজ যা দিয়ে জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণ বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে তৎক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং ২৭১ ধারায় সঙ্গরোধ সংক্রান্ত নিয়ম অমান্য করার শাস্তি ছয় মাস পর্যন্ত সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের ৬১ নং বিশেষ আইনটি প্রণীত হওয়ায় বর্তমানে দ-বিধির বিপরীতে স্পেশাল ল’ প্রাধান্য পাবে। আইনটির ৫ ধারায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কার্যাবলি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অধিদফতর ওই আইনের আওতায় যেকোনো উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে যেকোনো গণজমায়েত, পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষাণসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। ৬ ধারার একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটি, ৭ ধারায় কমিটির কার্যাবলি, ৮ ধারায় কমিটির সভা সংক্রান্ত বিধি-বিধান আলোচনা করা হয়েছে, ৯ ধারায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধি-বিধানের অনুসরণ, ১০ ধারার সংক্রামক রোগের তথ্য সংগ্রহ, ১১ ধারায় সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধান এবং ১২ ধারায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা, ১৩ ধারায় রোগাক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহৃত দ্রব্যাদির বিশুদ্ধতা বা ধ্বংস করার ক্ষমতা, ১৪ ধারায় রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাময়িক বিছিন্নকরণের বিধান, ১৫ ধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিদর্শন, ১৬ ধারায় সংক্রমিত স্থান বা স্থাপনা জীবাণুুমুক্তকরণ বা বন্ধকরণ ইত্যাদি, ১৭ ধারায় স্থাপনা ধ্বংসকরণ, ১৮ ধারায় যানবাহন জীবাণুমুক্তকরণের আদেশ দেয়ার ক্ষমতা, ১৯ ধারায় জীবাণুযুক্ত যানবাহন দ্রব্যাদি জব্দকরণ, ২০ ধারায় মৃত দেহের সৎকার, ২১ ধারায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, ২২ ধারায় আমদানি ও রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা, ২৩ ধারায় সরকারি ব্যয়ের অর্থ ফেরত গ্রহণের ক্ষমতা ইত্যাদি সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়েছে।
শাস্তি ও দণ্ড : ওই আইনের ২৪, ২৫, ২৬ ধারায় শাস্তি ও দণ্ড সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়েছে। ২৪ ধারামতে, যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুুর বিস্তার ঘটান বা ঘটাতে সাহায্য করেন বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বে¡ও অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার স্পর্শে আসার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তার কাছে গোপন করেন, তাহলে ওই অপরাধের জন্য তিনি অনূর্র্ধ্ব ছয় মাসের কারাদণ্ডে বা অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ২৫ ধারার বিধান মতে, মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া বা নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানালে ওই অপরাধের জন্য তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্র্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ২৬ ধারার বিধান মতেÑ সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা সত্ত্বে¡ও ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল-মিথ্যা তথ্য দিলে তার শাস্তি দুই মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ আইনে অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অপরাধগুলো অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য। ৩১ ধারায় আইনের অস্পষ্টতা, অসঙ্গতি দূরীকরণ, ৩২ ধারায় আইনের উদ্দেশ্য পূরণে বিধি প্রণয়ন, গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি ও ৩৩ ধারায় তফসিল সংশোধন ইত্যাদির ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।
এই আলোচনার মাধ্যমে আইনটি সম্পর্কে আশা রাখি, সংশ্লিষ্ট সবার ধারণা পরিষ্কার হবে।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী
bhrfctg@gmail.com
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়নকল্পে একটি বিশেষ আইন...
