দেশের মোট যাত্রীর ১৪-১৫ শতাংশ নৌপথে চলাচল করে। প্রচুর লোক চলাচল করলেও নৌপথ নিয়ে কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। অথচ বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় নৌপথের ব্যবহার জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নৌপথে আরামদায়ক ও স্বল্প ব্যয়ে ভ্রমণ করা যায় বিধায় বিপুল যাত্রী পাওয়া সম্ভব। তবে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা না গেলে নৌভ্রমণে রেলের মতো বিপুল যাত্রী পাওয়া সম্ভব নয়।
দেশে মাঝে মাঝেই বড় বড় নৌদুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। আর ছোট ছোট দুর্ঘটনা নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না। ফলে নৌপথও নিরাপদ নয়।। অথচ নদীপথ প্রাকৃতিক দান। তার নির্মাণের ব্যয় নেই। এখানে তাই লাভালাভ কম। তা ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই ‘রোড লবি’ খুবই শক্তিশালী। এ রোড লবিতে রয়েছে মোটরযান নির্মাতারা। সড়কপথের বৃদ্ধি তাদের যান বিক্রি বাড়িয়ে দেয়। সড়ক নির্মাতাদের সঙ্গে যারা জড়িত তারাও কম শক্তিশালী নন। পক্ষান্তরে, নদীপথ কুইক মানির নিশ্চয়তা দেয় না। এসব মিলিয়ে দেশের নৌপথ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বিশেষ নজর কাড়াতে পারেনি। ফলে নৌপথের যাত্রীরা অবহেলার শিকারে থেকেছে দিনের পর দিন।
আমাদের দেশে নৌপথে চলাচালের জন্য অন্যতম বাহন লঞ্চ। দেশে যাত্রীবাহী লঞ্চসহ বিভিন্ন শ্রেণীর নিবন্ধীকৃত নৌযানের সংখ্যা প্রায় ৭,৫০০। এর মধ্যে যাত্রীবাহী লঞ্চের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও চট্টগ্রাম দফতর থেকে অভ্যন্তরীণ নৌযানের সার্ভে করে। ওই সব দফতরে সার্ভেয়ারের সংখ্যা মাত্র একজন। একটি জাহাজের বহুমুখী বৈশিষ্ট্য থাকে। জাহাজটির ইঞ্জিন পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয়, জাহাজটির ডেক পরিচালনা, স্থাপত্য বা নির্মাণ কৌশল সম্পর্কিত বিষয় প্রভৃতি। এর জন্য পৃথক কতকগুলো ধাপ বা পর্যায় রয়েছে। সুতরাং সার্ভের বিষয়টিতে টিম ওয়ার্ক বা যৌথ পরিদর্শক ব্যবস্থা থাকা উচিত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌযানের চেয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের অফিস কাঠামো বা জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। অতএব সার্ভেয়ারের ওপর প্রবল চাপ। একজন সার্ভেয়ারের বছরে যে সংখ্যক জাহাজ সার্ভে করতে হয়, তা যৌক্তিকভাবে করা সম্ভব না হলেও সার্ভে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হচ্ছে। তাই সার্ভের সময় সুনিরাপত্তা বিধানে সতর্কতা বা সাধারণ মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
নৌপথের টার্মিনালগুলো সার্বিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট ঘাটে পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব সারে। ওই টার্মিনালে ওঠানামার ব্যবস্থায় সিঁড়ি আছে কি না, জল-কাদার মধ্য দিয়ে যাত্রীরা আদৌ নিরাপদ কি না, তা ভেবে দেখা হয় না।
ঘাট ব্যবস্থাপনা ও যাত্রী নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত দুরূহ ও জটিল কাজ। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোর ঘাট ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ নিয়োজিত করা হয় না। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম থেকে যায়। অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা উন্নয়নে ড্রেজারের সংখ্যা ও ড্রেজিং বাবদ বরাদ্দের পরিমাণও যৎসামান্য। বিআইডব্লিউটিএ’র আছে মাত্র কয়েকটি ড্রেজার, যার মধ্যে চারটি মোটামুটি নির্ভরশীল ও অপর তিনটি প্রায়ই মেরামতের মাধ্যমে চালানো হয়।
সীমিতসংখ্যক যাত্রীবাহী লঞ্চে প্রতিনিয়ত ওভারলোডিং হয়ে থাকে। ওভারলোডিং থেকে যাত্রীদের বিরত রাখা খুবই কঠিন। এ ক্ষেত্রে যে আইন রয়েছে, তা খুবই দুর্বল। এ পর্যন্ত যেসব বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে তার বেশির ভাগ ঘটেছে ওভারলোডিংয়ের কারণে। কেবল ঝড় ও চরের কারণেই নয়, নৌযান পরিচালক, সারেং, সুকানিদের অদক্ষতা, দায়িত্বহীনতা, নৌপথে সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে নৌপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোর ত্রুটিপূর্ণ নকশা, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী না করার গুরুতর অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। দেখা গেছে, প্রতিটি নৌপরিবহনের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের ওপর দোষ চাপিয়ে এমন সব রিপোর্ট পেশ করছে, যাতে ওই সব তদন্তের মুখ্য উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। এ ছাড়া লঞ্চের বীমা, ফিটনেস, রুট পারমিট প্রভৃতির বিষয়েও চরম অনিয়ম লক্ষ করা যায়।
লঞ্চ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। ১৯৮৫ সালে কালবৈশাখী ঘূর্ণিঝড়ে মুন্সীগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় প্রায় ৫০০ যাত্রী নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের একটি লঞ্চ সম্পূর্ণ উল্টে যায়। ১৯৯০, ২০০১, ২০০৩, ২০০৪, ২০১২ সালে পরপর কয়েকবার চাঁদপুর মোহনায় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনা ছিল স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যাতে বহু যাত্রী প্রাণ হারান। কয়েকজনের লাশ স্বজনের কাছে পৌঁছেছিল। বাকিরা হারিয়ে গেছেন নদীতে। ২০০১ সালে চাঁদপুর মোহনায় এমভি রাজহংস নামে একটি লঞ্চডুবিতে তিন শতাধিক যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। ২০০২ সালের ৩ মে চাঁদপুরের মতলবে মেঘনায় ডুবে যায় এমভি সালাউদ্দিন নামে আরেকটি লঞ্চ। এতে চার শতাধিক যাত্রীর করুণ মৃত্যু হয়। এতসব দুর্ঘটনার পরও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতার অভাব লক্ষ করা যায়। ফলে হাজার সমস্যা ও ভিড় ঠেলে ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় লঞ্চ চলাচল না করে রেডিও-টিভির আবহাওয়া বার্তা মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই এড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া যাত্রীবাহী লঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো গেলে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের ফলে ঘটা দুর্ঘটনা এড়ানোও সম্ভব। স্বজনহারাদের বুক চাপড়ে নদীতীরকে ভারাক্রান্ত করার দৃশ্য যাতে আমাদের দেখতে আর না হয়, এ ব্যাপােের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, লঞ্চমালিক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেÑ এটিই সবার প্রত্যাশা।
অন্য দিকে উন্নত লঞ্চ সার্ভিস চালু করতে পারলে নৌপথে যাতায়াতের জন্য যাত্রীর কোনো অভাব হবে না। দক্ষিণাঞ্চলের বিলাসবহুল লঞ্চ সার্ভিসই এর বড় প্রমাণ। তাই নৌপরিবহনের উন্নয়নে এ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নদীপথে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করতে হবে। বিআইডব্লিউটিসির উপকূলীয় দ্বীপগুলোর সার্ভিসের সংখ্যা বাড়ানোও সময়ের দাবি। এ জন্য দেশের অভ্যন্তরে নৌপথে সার্বিক দায়িত্ব আগের মতো বিআইডব্লিউটিএ’র ওপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। আর উপকূলীয় ও সমুদ্রপথে সার্বিক দায়িত্ব সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের ওপর পুনর্বহাল করা হলে এই নৌপথ ব্যবস্থাপয় স্বাভাবিক গতি ফিরে আসবে বলেই মনে হয়।।
নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌ নিরাপত্তা আইনের সংশোধন করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ওপর নজর দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নৌ খাতের সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যবহার এবং সেই লক্ষ্যে আর্থিক, প্রশাসনিক, কারিগরি ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া দরকার।